মানুষের মন

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:০৩
মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। কখন কার মনে কি ভাবের উদয় হয় তা কেউ বলতে পারে না। মানব মনের এমন বিচিত্রতার কারণেই অনেক রাজার এক সময় আর সিংহাসন ভাল লাগে না, অনেক রাজপুত্র সিংহাসনে বসতেই চান না। অনেকে আবার একবার সিংহাসন পেলে ইহজীবনে তা ছাড়তে চান না। ইতিহাসে এমন সব ঘটনার ভূরি-ভূরি প্রমাণ আছে। অতীত জামানার এমন রাজাধিরাজ বা বর্তমান জামানার এমন সব প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কথা বাদ দিলে আবার এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা ধনসম্পদের জন্য পাগল। তারা রাজত্ব লাভের নেশায় মত্ত না হলেও নিজের চারপাশে ধনসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন এবং ধনসম্পদ আহরণের নেশায় আমৃত্যু মত্ত থাকেন। পাশাপাশি আর এক শ্রেণীর মানুষকেও দেখা যায় যারা ধনসম্পদের বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তারা যেমন রাজাধিরাজ হওয়ার জন্য সে পথে পা বাড়ান না, তেমনি ধনসম্পদ আহরণের দৌড়েও শামিল হন না। এই ধরনের এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে রাজাধিরাজ হওয়ার মত সম্ভাবনা, সুযোগ, শিক্ষা-দীক্ষা, যোগ্যতা বা ধনসম্পদ আহরণের মত প্রচুর সুযোগ-সুবিধা, সম্ভাবনা যোগ্যতা ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও তারা কখনও ঐ পথে পা বাড়ান না। কারণ জীবনকে তারা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। এসব শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যুগ যুগ ধরে আমি উপরোক্ত বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পদচারণা, চিন্তাধারা লক্ষ্য করে আজ ষাটোর্ধ বয়সে এসে নিজেকে কোন্ শ্রেণীতে ফেলবো তা নিয়ে ভাবতে বসেছি। আজ বত্রিশ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছি এবং বেশ কয়েকবার জায়গা-জমি, ঘরবাড়ি ক্রয়-বিক্রয়, অদল-বদল করে আর্থিক সচ্ছলতায় উচ্চ মধ্যবিত্তের পর্যায়ে এসেছি। একমাত্র পুত্র অষ্ট্রেলিয়ার নাগরিক এবং ডাক্তার, পুত্রবধূও তাই। একমাত্র কন্যাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সবাই বিবাহিত জীবনে তাদের ঘরসংসার নিয়ে সুখী। শুরু হতেই তাদের লেখাপড়াসহ, সুস্বাস্থ্য রক্ষা ইত্যাদিতে নিজেকে সর্বাত্মক নিয়োজিত রেখেছি। এখন তারা কেউ আমার সাথে থাকে না, থাকার কথাও নয়। যে যার ভবিষ্যত্ চিন্তা নিয়ে নিজের মত এগুচ্ছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী তাদের ভবিষ্যতের পথে যাতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা না হই সে চেষ্টাই করি, একা থাকি। তারাও আমাদের একা থাকা নিয়ে ভাবে না। এ অবস্থায় আমার মনও বিচিত্র হয়ে উঠেছে। ঢাকায় আর থাকবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দশ বছর আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলাম এবং কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদকসহ পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য হয়েছিলাম। ভাবছি পাবনা গিয়ে সেখানে এক নাগাড়ে অবস্থান করে রাজনীতি করবো। কিন্তু স্ত্রীর তাতে সম্মতি নেই। পাবনা মফস্বল শহর, ছোট জায়গা, সেখানকার মানুষ বেশি পীড়া দিবেন, বিড়ম্বিত করবেন এমনটি তার ধারণা! আমি তাকে বুঝাচ্ছি, এখন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নেই, বাড়িটিও ভাড়া দিয়ে দিয়েছি, ভাড়ার টাকায় পাবনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা যাবে, ঢাকায় থাকার দরকার কি? তারপরও স্ত্রী নিমরাজি। ভাবলাম এতেই চলবে। আমি আমার বাকি জীবন সেই মাটিতে বিচরণ করবো যেখানে আমার শৈশব কেটেছে ধানক্ষেতের দোলা দেখে, সম্পূর্ণ কৈশোর এবং যৌবনের একটা অংশ কেটেছে গাছে গাছে পাখির কূজন শুনে, নদীতে, পুকুরে সাঁতার কেটে, হাডুডু, ফুটবল খেলে। আমি বাকি জীবন সেখানেই কাটাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার গ্রাম, যে গ্রাম এখন শহর হয়েছে, সেই গ্রামের মানুষের সাথে আবার আমি পথ চলবো, হাসবো, খেলবো, কথা বলবো। যে ঢাকা শহর এক সময় আমাকে হাতছানি দিয়েছিলো সেই রাজধানী ঢাকাকে আমি বিদায় জানাতে ভাবলাম —সত্যি মানুষের মন কতই না বিচিত্র! লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন