কংগ্রেসের ভবিষ্যত্ কর্ণধার রাহুলই!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৪
উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিকতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ তিন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিত একটু লক্ষ্য করলেই তা সহজেই চোখে পড়বে। ভারতের রাজনীতিতে গান্ধী-নেহেরু পরিবারের প্রভাব এখনো অটুট। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং হলেও এর মূল চালক সোনিয়া গান্ধী। দল ও জোটের প্রধানের পদ এখনো তিনি অলঙ্কৃত করে রেখেছেন। জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন মনমোহন সিং। বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর। তাই আগামী নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী হলেও তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ পদে দেখা যেতে পারে অন্য কাউকে। এই সম্ভাব্য অন্য ব্যক্তিটি হলেন রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক থেকে সম্প্রতি দলটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দলে সোনিয়া গান্ধীর পরই এখন তার অবস্থান। কংগ্রেস সমর্থকদের অনেক দিনেরই প্রত্যাশা যে, রাহুল গান্ধী তার পরিবারের রাজনৈতিক ধারা ও দলের নেতৃত্বের হাল ধরবেন। কিন্তু এসব দায়িত্ব গ্রহণে জোর দাবি না তোলায় এখনো দূরে রয়েছেন রাহুল গান্ধী। গত ২০ জানুয়ারি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি রাহুল গান্ধীকে দলের সহ-সভাপতি করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি কংগ্রেসের নীতি নির্ধারকেরা সমর্থন করেন। এর মাধ্যমে মা সোনিয়া গান্ধীর পর দলের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেন রাহুল। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জোট বিজয়ী হলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন। অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রার্থী কে হবেন তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। গুজরাটে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপি’র সবচেয়ে সফল নেতা হিসেবে নিজের অবস্থানের কথা জানান দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয়তা কম থাকায় মোদি প্রার্থী হলে বিজেপির জোট গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আগামী নির্বাচনে তার ভূমিকা কী হবে তা এখনো অজানা। রাহুল গান্ধী অনেক বছর ধরেই দুটি যুব সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ইয়ুথ কংগ্রেস ও ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’র মাধ্যমে তরুণদের মাঝে নিজেকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। সম্প্রতি সোনিয়া গান্ধী এক বক্তব্যে বলেছেন, আগামী নির্বাচনের সবচেয়ে বড় কৌশল হবে ভারতের তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করার পথ খুঁজে বের করা। কারণ বর্তমানে অর্ধেকের বেশি ভারতীয়ের বয়স ২৫ বছরের নিচে। তার এ মন্তব্যে মনে হয়েছে, দলের বড় দায়িত্ব গ্রহণে ছেলে রাহুল গান্ধীকে তিনি সামনে নিয়ে আসবেন। রাহুল গান্ধীর বয়স ৪২ বছর। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গণে তাকে যুবক ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। কারণ বর্তমানে ভারতের রাজনীতিবিদদের গড় বয়স প্রায় ৬৫ বছর। রাহুল গান্ধী ১৯৭০ সালের ১৯ জুন জন্মগ্রহণ করেন। রাজিব ও সোনিয়া গান্ধীর প্রথম সন্তান রাহুল বেড়ে ওঠেন অরাজনৈতিক পরিবেশে। তার পাইলট বাবা রাজিব গান্ধীর কখনো ইচ্ছা ছিলো না রাজনীতিতে আসার। তবে তার চাচা সঞ্জয় গান্ধী রাজনীতিতে ছিলেন। কিন্তু ১৯৮০ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয় গান্ধী নিহত হওয়ার পর অনাগ্রহী রাজিব গান্ধী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এর মাত্র চার বছর পর ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হন। আর এর পরই কংগ্রেসের নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন রাজিব গান্ধী। মাত্র ৪০ বছর বয়সে ভারতের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তার ২০ বছর পর অনাগ্রহী রাহুল গান্ধী প্রবেশ করলেন রাজনীতিতে। ২০০৪ সালে তিনি আমেথি আসন থেকে লোকসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ আসন থেকে তার বাবা রাজিব গান্ধীও নির্বাচন করেছিলেন। রাহুলকে সাদরে গ্রহণ করেছিলো আমেথিবাসী। তাদের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না যে, আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রীকে এখন তারা ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, কংগ্রেসের পরিকল্পিত চিত্রনাট্য অনুযায়ী রাহুল গান্ধীকে দলের সহ-সভাপতি করা হয়েছে। লোকসভা ভোটের আগে তাঁর এই আনুষ্ঠানিক উত্থানে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তৃতীয় ইউপিএ সরকার গঠিত হলে রাহুলই হবেন প্রধানমন্ত্রী এমনটাই মনে করছেন তারা। তবে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব এখনই বিষয়টি স্পষ্ট করতে চাইছে না। রাহুল গান্ধীকে কংগ্রেসের সহ-সভাপতি করা হলেও ভোটারদের মন জয়ে তার ব্যক্তিগত কারিশমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উত্তর প্রদেশ এক সময় কংগ্রেসের ঘাঁটি ছিলো। ২০০৭ ও ২০১২ সালে সেখানে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। ২০১২ সালে আগের নির্বাচনের থেকে কংগ্রেস চারটি আসন কম পেয়েছে। এ পরাজয়ের দায়ভার রাহুল গান্ধীই নিয়েছিলেন। ২০১০ সালে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর ইচ্ছাই জোটের বাইরে থেকে আলাদা নির্বাচন করে কংগ্রেস। সেখানে ২৪৩ আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র চারটি আসন পায়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তাই রাহুলকে পরিহাস করে বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান। তার উচিত আগে কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া। বিজেপি নেতা অরুন জেটলি বলেন, প্রতিপক্ষ মনে করে শুধু পারিবারিক কারিশমা দিয়ে নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়। কয়েকদিন আগে এএফপি’র এক বিশ্লেষণে বলা হয়, রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সহ-সভাপতি হলেও তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা ও নীতিনির্ধারণের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নয়াদিল্লির বিভিন্ন বিপণীকেন্দ্র ও রেস্তোরাঁয় রাহুলের উপস্থিতি প্রায়ই দেখা যায়। নিম্নবর্ণ বা দলিত সমপ্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে রাহুলের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা এবং দিল্লির মেট্রোরেলে ভ্রমণের দু-একটি ঘটনা ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় তার এক ধরনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। তবে সাক্ষাত্কার বা প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ২০১১ সালে ফাঁস হওয়া এক মার্কিন তারবার্তায় রাহুলকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। রাহুলের রাজনৈতিক অর্জন তেমন আহামরি কিছু নয়। অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর ভাবনা বা নেতৃত্ব সম্পর্কে ভারতীয়দের ধারণা অস্পষ্ট। বর্তমানে শরিকদের অনেকেই ইউপিএ ছেড়ে গেছে। নতুন দল খুঁজে বের করার পাশাপাশি যে সব রাজ্যে কংগ্রেস দুর্বল সেখানে দলকে টেনে তোলার দায়িত্বও রাহুল গান্ধীর কাঁধে। তাই প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে জল্পনার মধ্যেই আগামী দিনে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তিনি। তবে রাজনৈতিক ভাষ্যকার এম জে আকবরের মতে, আগামী বছর অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে রাহুলই কংগ্রেসের প্রচারাভিযানে নেতৃত্ব দেবেন এবং জনসমর্থন পেলে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য যোগ্যতম প্রার্থী। আউটলুকের জরিপ ্বআপনার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি কে? নরেন্দ্র মোদি - ৪৯.৫% রাহুল গান্ধী - ৪০.৫% মন্তব্য করেননি - ১০% কংগ্রেস থেকে রাহুল এবং বিজেপি থেকে মোদি আগামী নির্বাচন করলে কাকে ভোট দেবেন? কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ - ৪১.১% বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ - ৩৮% কোনটিই না - ৮.৫% মন্তব্য করেননি - ১২.৪% রাহুল প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ না করলে কাকে পছন্দ করবেন তিনি? পি চিদাম্বরাম - ৪৯.৯% দিগ্বিজয় সিং - ১৪.৪% একে এ্যান্টনি - ১৩.৫% অন্যান্য - ২০.২% প্রিয়াংকা গান্ধী কি রাজনীতিতে আসবেন? হ্যাঁ - ৩৭.৮% না - ২৯.৮% হতে পারে - ২৪% কিছুই বলেননি - ২৪% রাহুলের গুণ কঠিন পরিশ্রমী - ৪০.১% পরিষ্কার ইমেজ - ৩৭.৬% আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত - ২২.৪% নেতৃত্বের যোগ্যতা নেই - ১৭.৬% দুর্বল বক্তা - ১৫% দায়িত্ব এড়িয়ে যান - ১১.৬% ইউপিএ আবার ক্ষমতায় আসলে রাহুল গান্ধীর কী করা উচিত? প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ করা উচিত - ৩৮.৫% প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ উচিত নয় - ৩৩.৪% মন্তব্য করার সময় হয়নি - ২৮.১% ২২-২৪ জানুয়ারি ভারতের ‘আউটলুক’ ম্যাগাজিন দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, লক্ষেৗ এবং আহমেদাবাদে মোট ৮ শ জনের মধ্যে এই জরিপ চালায়। ইন্ডিয়া টুডে’র এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ পাবে ২০৩টি (তাদের বর্তমান আসন ১৫৯টি), কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ’র বর্তমান আসন ২৫৯টি থেকে নেমে ১৫৭টিতে আসবে। রাহুল এবং মোদির মধ্যে রাহুলকে চায় ৪১% এবং মোদিকে চায় ৫৭%।