প্রাতঃকালে পাঠরত এক যুবকের পাশে লাস্যময়ী ডায়ানা। এই দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করা হইয়াছিল ৩২ বত্সর আগে, ১৯৮১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। এর মাত্র দুইদিন পরে ডায়ানা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ব্রিটেনের রাজকুমার প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে। বাকিংহাম প্রাসাদে প্রবেশের দুইদিন আগে তোলা ছবিটি কৌতূহল উদ্দীপক নিঃসন্দেহে। কে সে, পাঠে নিমগ্ন এই যুবক। কুড়ি বত্সরের নন্দিতা এক নন্দিনীর পাশে যুবকের ছবি চিত্ত দোলায়িত করিয়া যায় বৈ কি! তাহা হইলেও পত্রিকার ফটোসম্পাদক ছবিটি ছাপার যোগ্য বলিয়া মনে করেন নাই তখন। কিন্তু এতদিন পরে সেই বাতিল ছবিটি হইয়া উঠিয়াছে অতিমূল্যবান। খবর পাওয়া গিয়াছে প্রিন্সেস ডায়ানার এই ছবি নিলামে উঠিয়াছে, বিক্রিও হইয়া গিয়াছে ১৮ হাজার ৩০৬ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশের কিংবা স্বল্পোন্নত অন্য যে কোনো দেশের মুদ্রার হিসাবে ইহা অনেক টাকা। কিন্তু যিনি কিনিয়াছেন তাহার জন্য ইহা মোটেও বেশি নহে। টাকার চাইতে সখের মূল্য অনেক বেশি। সখের সাথে সুখের যে এক গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রহিয়াছে তাহাতে আর সন্দেহ কী! মনে সুখ না থাকিলে সখ উধাও হইয়া যায়। সখের দেখা পান না অসুখী মানুষ। চিত্তবৃত্তি তাহার হইয়া উঠে না কখনও।
সখের সাথে সুখের সম্পর্ক বুঝিতে কাহারও কষ্ট না হইলেও ধনের সাথে সুখের সম্পর্ক আছে, একথা অনেকেই স্বীকার করেন না। তাহারা বলেন, সুখ আসলে একটা মানসিক অবস্থা। নির্ধন ব্যক্তিও সুখী হইতে পারেন, যদি যাহা আছে তাহা লইয়াই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল তো এই নিয়া একখানা বই-ই লিখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু বাস্তবে ধন না থাকিলে সুখের দেখা মিলে কদাচিত্। সুখ নিজেই তখন বড় এক অসুখ হইয়া দেখা দেয়। চিত্তবৃত্তি তখন দেখা দেয় নিত্য বেদনার কারণ হইয়া। লোকে পরিহাস করিয়া বলে, গরীবের ঘোড়ারোগ হইয়াছে। ঘোড়ারোগ মানে কী! যাহার কিনিবার ও পালন করিবার সামর্থ্য নাই, তাহার ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়াইবার সখ জাগিলে যে পেরেশানির উদ্ভব ঘটে, উহাকেই বোধহয় ঘোড়ারোগ বলা হইয়া থাকে। ধনবান সমাজে এই ধরনের রোগের উত্পাত নাই। সুখ, সখ ও টাকা বা সম্পদকে তাহারা আলাদা করিয়া দেখে না। কমিউনিস্টদের মত ধনবাদীরা উচ্চকণ্ঠে জয় সর্বহারা বলিয়া গরীবীর মহিমা প্রচার করে না। তাহারা ধনের মহিমা কীর্তন করে। পরিশ্রম করিয়া মেধা ও মননের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করিয়া কি প্রকারে টাকা উপার্জন করা যায়, সম্পদ আহরণ করা যায় সেই শিক্ষাই প্রচার করে। ধনবাদী রাষ্ট্রও জনসাধারণ্যে সঞ্চারিত করিয়া যায় সেই প্রেরণা, সেই সুযোগ, শক্তি ও সাহস। ইহাই পুঁজিবাদের সৌন্দর্য।
বাস্তবিক পক্ষেই আয়-রোজগার ভাল না হইলে, ধনসম্পদ না থাকিলে মানুষের মনন-মেধা সৃজন ও সৌন্দর্যবোধের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে না। টাকা ছাড়া মানুষের কী একদিনও চলে! নুন আনিতে যাহার পানতা ফুরায় তাহার মনে সখের উদয় হইবে কেমন করিয়া! পক্ষান্তরে, দুনিয়ায় সুখী মানুষের সখের অন্ত নাই। সুখি ও সৌখিন লোকেরা সখ করিয়া এমন অনেক কিছু করেন যাহা নিতান্তই মনের ক্ষুধা মিটাইবার জন্য। কেহ সংগ্রহ করেন ডাকটিকেট, কাহারওবা সখ পুরাতন কয়েন সংগ্রহ করা। এন্টিকের পর এন্টিক সংগ্রহ করেন অনেকেই। কেহ কেহ এমনও আছেন, যাহারা বাড়িতেই গড়িয়া তোলেন মিনি মিউজিয়াম। সুখী মানুষেরা বাগান করেন, গাছ লাগান, দেশি-বিদেশি প্রাণি ও পাখি পোষেণ। এইসবের পিছনে টাকা ও সময় দুই-ই ব্যয় করেন। বোধগম্য কারণেই ধনবাদী দেশসমূহের ধনবান মানুষের মধ্যে এই ধরনের বহু বিচিত্র সখের চর্চা দেখিতে পাওয়া যায়। সেইসব দেশে একটি ছবির জন্য ১৮ হাজার কী ১৮ লক্ষ ডলার ব্যয় করিবার মানুষেরও অভাব হয় না। কোনো একটি দেশ ও দেশের মানুষ সম্পদশালী কিনা, তাহা বুঝিতে পারা যায় সখের চর্চা দেখিয়া। বলাইবাহুল্য ধনবান হওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরঞ্চ সুখময় জীবনের জন্য মানুষের ইহা এক মহত্ সাধনা। এই সাধনার পথ প্রশস্ত না হইলে অধরা থাকিয়া যায় সুখ ও সখ উভয়ই। ইহাই বাস্তবতা।
