গত বৃহস্পতিবার ভোরে আখাউড়া হইতে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়িয়া যাওয়া তিতাস কমিউটার ট্রেনে ভয়াবহ ডাকাতি সংঘটিত হয়। এ সময় বাধা দেওয়ার কারণে ভাদুঘর সেতুর ওপরে পাঁচ যাত্রীকে ট্রেন হইতে ফেলিয়া দেয় সশস্ত্র ডাকাতরা। ইহাতে একজন নারীসহ চারজন নিহত হইয়াছেন। যাত্রীবেশে ডাকাতদের এই তান্ডবের ঘটনায় যাহারা নিয়মিত বা অনিয়মিত রেলভ্রমণ করিয়া থাকেন তাহাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা দেখা দিয়াছে। শুধু তাহাই নহে, সম্প্রতি ট্রেনে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি রেললাইনের কাটা লাশ উদ্ধারের ঘটনা বাড়িয়া গিয়াছে আশংকাজনক হারে। হত্যার পর লাশ রেললাইনের নিচে ফেলিয়া দিয়া তাহা দুর্ঘটনা হিসাবে প্রচারের প্রবণতাও দেখা যাইতেছে। গত ৬ মাসে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে ৩৬০টি কাটা লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। তন্মধ্যে গাজীপুর রুটেই ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হইয়াছেন ৪৭ জন যাত্রী। তাহাদেরকে চলন্ত ট্রেন হইতে ফেলিয়া দিয়া হত্যা করা হয়। ইহাছাড়া ট্রেনে রহিয়াছে অজ্ঞান পার্টি আর পকেটমারদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য ।
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল ও জনবহুল দেশে গণপরিবহন হিসাবে রেলওয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু লোকবল-লোকোমোটিভ সংকট, রেল লাইন ঘেঁষিয়া অনিরাপদ বস্তি ও জরাজীর্ণ রেল লাইনসহ রেলওয়ের সমস্যার অন্ত নাই। তবে ইদানীং যাত্রীদের নিরাপত্তার অভাবই রেলওয়ের সবচাইতে বড় সমস্যা হইয়া দেখা দিয়াছে বলিয়া অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। বলিতে গেলে রেলওয়ের নিরাপত্তার সেই পুরাতন ধারা এখনও বজায় রহিয়াছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুইভাবে বিভক্ত। এক. রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। তাহাদের দায়িত্ব শুধু রেলের সম্পদ পাহারা দেওয়া। দুই. রেলওয়ে পুলিশ, যাহারা পুলিশ বাহিনী হইতে প্রেষণে নিযুক্ত। রেলওয়ের চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধ এবং লাশ উদ্ধার ও মামলা তদন্তসহ রেলযাত্রীদের যাবতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে এই বাহিনী। কিন্তু নানা সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত এই রেলওয়ে পুলিশ বিভাগ। যেমন—১৯ কামরার এক্সপ্রেস ও মেইল ট্রেনের নিরাপত্তায় থাকেন মাত্র ৪-৫ জন রেল পুলিশ। তাহাদের বেশীরভাগই আবার লাঠিধারী কনস্টেবল। টহল বাহিনীর নেতৃত্ব দেন বড় জোর একজন এএসআই কিংবা এসআই। তাও আবার রাতের ট্রেনগুলিতে। টহল পুলিশ কর্মীরা যাহাতে নিজেদের মধ্যে অবিরত যোগাযোগ রাখিতে পারেন সেজন্য নাই কোন ওয়াকিটকি। ফলে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনেই যোগাযোগ রাখিতে হয় টহল পুলিশকে।
প্রকৃতপক্ষে রেলওয়ে পুলিশ এখন ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দারে পরিণত হইয়াছেন। তাই রেলওয়ে পুলিশের উন্নতি বিধানে সরকারকে সচেষ্ট হইতে হইবে। উল্লেখ্য, রেলওয়ে পুলিশ সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। যাহারা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের নেকনজর পাইতে ব্যর্থ হন বা কোনভাবে বিরাগভাজন হন, তাহাদেরকেই এখানে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এমতাবস্থায় তাহারা আর কিইবা করিতে পারেন! এ কারণে রেলওয়ের নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। সবচাইতে বিপত্তি ঘটে রাতের মেইল ও কমিউটার ট্রেনগুলিতে। এ ট্রেনগুলিতে করিডোর দিয়া চলাচলের সুযোগ নাই। ট্রেনগুলির এক বা দুইটি কামরায় পুলিশ অবস্থান গ্রহণ করিলেও বাকি কামরাগুলি থাকিয়া যায় অনিরাপদ। আবার এসব ট্রেনের অধিকাংশ কামরায় রাতে আলো থাকে না। তাই ট্রেনের যাত্রী নিরাপত্তা বাড়াইতে হইলে রেল পুলিশের জনবল ও রাতের ট্রেনগুলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখা অতীব প্রয়োজন।
বস্তুত ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রথম রেললাইন চালু হইয়াছিল ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর। শুরুটা ছিল দর্শনা ও কুষ্টিয়ার জগতি এলাকার মধ্যে ৫৩.১১ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে। সেখানে বর্তমানে রেললাইন ২ হাজার ৮৫৫ কিলোটিমার। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন হইলেও রেললাইন প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে নাই। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন জামতলী-ইব্রাহিমবাদ হইয়া যুমনা ব্রিজ পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন স্থাপন করা হয়। গত কয়েক বত্সরে লোকবল স্বল্পতার অজুহাতে রেলের মোট ১১৭টি স্টেশন বন্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। এই সময়ে রেলের দুই অঞ্চলে বেশকিছু শাখা লাইন বন্ধ কিংবা লাইনে ট্রেন চলাচল কমানো হইয়াছে। ইহাতেই বোঝা যায়, রেলওয়ে আজ কতটা অবহেলিত। তাহার উপর সম্প্রতিকালে রেলভাড়া বাড়ানো হইয়াছে। কিন্তু যাত্রীসেবার মান বাড়িতেছে না। যাত্রীসেবার মধ্যে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে অবশ্যই। বর্তমানে রেলওয়ের দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রতিদিন চলাচলকারী ২৮৮টি ট্রেনে প্রায় আড়াই লাখ রেলযাত্রী চলাচল করিতেছেন। তাহাদের চলার পথ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করিতে গ্রহণ করিতে হইবে সর্বাত্মক উদ্যোগ।
