নারায়ণগঞ্জে পাটের গুদামে একের পর এক আগুন লাগিতেছে। ইত্তেফাকের খবরে প্রকাশ, কয়েকদিন আগে চারদিনের ব্যবধানে দেশের প্রধান পাট ব্যবসার কেন্দ্র বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জ মোকামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে আগুন লাগে। ইহাতে প্রায় ৫৫ হাজার মণ পাট পুড়িয়া গিয়াছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক কোটির টাকারও বেশি। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তরফ হইতে নিশ্চিত করা হইয়াছে যে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হইতে এই আগুন লাগে নাই। কেননা পাটের গুদামগুলিতে বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না। এমতাবস্থায় অনেকে পাটের গুদামে উপর্যুপরি আগুন লাগার ঘটনাকে পরিকল্পিত বা নাশকতামূলক কর্মকান্ড হিসাবে বিবেচনা করিতেছেন।
প্রথমত বর্তমানে পাটের দাম কমিয়া যাওয়ায় পাট মালিকরাই পরিকল্পিতভাবে গুদামে আগুন লাগাইয়া থাকিতে পারেন বলিয়া ধারণা করা যাইতেছে। উদ্দেশ্য যাহাতে মজুদ পাটের বিপরীতে বীমা বা ব্যাংক ঋণ মওকুফের সুবিধা পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত সরকারের মেয়াদ যখন শেষ হইয়া আসে, তখন তৃতীয় বিশ্ব ও দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। এ সময় নানা নাশকতার ঘটনার আশংকাকে একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। উল্লেখ্য, গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ছিল পাট। তখন পাটকে বলা হইত সোনালি আঁশ। সোনালি আঁশের উপর নির্ভর করিয়া বাঙালিরা সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেন এবং দেশ স্বাধীন করেন। কিন্তু ১৯৭৩-৭৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় একের পর এক পাটের গুদামে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটিতে থাকে। ইহা লইয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেদোক্তি করেন এবং পাটশিল্প রক্ষায় প্রণয়ন করেন কঠোর আইন। আজ আবার কি সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটিতে যাইতেছে?
অবশ্য পাট এখন আর প্রধান রফতানিকারক পণ্য নহে, যদিও রফতানির তালিকা হইতে ইহা একেবারে বাদ পড়িয়া যায় নাই। বর্তমানে পাটের জায়গা দখল করিয়াছে তৈরি পোষাক। ইহার পরই আছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স। কৃষি ও উপরোক্ত দুইটি খাতকে কেন্দ্র করিয়া আমাদের অর্থনীতি প্রবাহমান ও বলিতে গেলে দিন দিন বলবান হইয়া উঠার চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই দুইটি খাতেই কোন না কোন সংকট লাগিয়াই আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিগণ যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখনই তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। সেই ঘটনায় মারা যায় এক শতাধিক নিরীহ গার্মেন্টস কর্মী। হইতে পারে ইহা কাকতালীয় কোন দুর্ঘটনা। আবার হইতে পারে নাশকতাও। তবে এই ঘটনার পর হইতে আমাদের উপর বিভিন্ন মাত্রার চাপ বাড়িয়াছে। কিছুদিন আগে আগুনে অঙ্গার হইয়া যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদেরও লাশ আসিয়াছে বাংলাদেশে। ইহাতে শ্রমিক পরিবারগুলির কপাল পুড়িয়া গিয়াছে।
পৃথিবীতে আগুনের অস্তিত্ব যখন আছে, তখন দুর্ঘটনায় আগুন লাগিতেই পারে। কিন্তু সব দেখিয়া শুনিয়া আমাদের লক্ষণ ভাল বলিয়া মনে হইতেছে না।
