কাতারে নির্মাণ শিল্পের বিপ্লব চলছে

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:১০
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৭০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উত্স হলপ্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যা সচল রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশির সিংহভাগই অদক্ষ শ্রমিক, তবে প্রকৌশলী এবং দক্ষ/প্রশিক্ষিত ডিপ্লোমাধারী লোকের সংখ্যাও কম নয়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের যে ছোট্ট দেশটির কথা সবার আগে চলে আসে তা হচ্ছে কাতার। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজকের দায়িত্ব পাওয়ার পর উন্নয়নের সুনামীতে এখন ভেসে চলেছে কাতার। মধ্যপ্রাচ্যে এখন নির্মাণ শিল্পে রীতিমত বিপ্লব চলছে। আরব উপসাগরীয় দেশ যেমন দুবাই, কাতার, আবুধাবী, সৌদি আরবের বিশাল নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার জন্য বিশ্বের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কন্সট্রাকশন কোম্পানিগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। নির্মাণকার্যে ব্যবহূত বিশ্বের ভারী ক্রেনের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয়। কাতার পেনিনসুলার দক্ষিণে হল সৌদি আরব আর বাকী তিন দিক ঘিরে রয়েছে পারস্য উপসাগর। কাতারের আয়তন হল ১১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার যা বাংলাদেশের আয়তনের মাত্র ৮ শতাংশ! দোহা শহরকে ঘিরেই কাতারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড, তাই কাতারকে একটি নগর রাষ্ট্র বললেও ভুল হবে না। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, কাতার বিভিন্ন সময়ে বাগদাদের আব্বাসীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে পর্তুগীজ, পারস্য, ও তুরস্কের ওসমান সাম্রাজ্যের মত সুপার পাওয়ারদের শাসনাধীন ছিল। এখন কাতার শাসন করছে আল-থানি পারিবার। সৌদি আরবের নাজাদ এলাকা থেকে কাতারে আসে থানি পরিবার। উল্লেখ্য, কাতারের থানি পরিবার ও সৌদি আরবের শাসক, সৌদ পরিবারের মধ্যে গোত্রীয় যোগাযোগ রয়েছে। কারণ এই দুই পরিবারেরই শেকড় হল সৌদি আরবের নাজাদ এলাকার। কাতারে তেল আবিষ্কৃত হয় ১৯৩৯ সালে। এর প্রায় এক দশক পর অর্থাত্ ১৯৪৯ সাল থেকে কাতার বহির্বিশ্বে তেল রফতানি শুরু করে। তেল আবিষ্কারের আগে সমুদ্রের মাছ ও মুক্তই ছিল কাতারের একমাত্র আয়ের উত্স। সেই কাতার আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ। তেলের পাশাপাশি কাতারের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ হল গ্যাস। অয়েল এন্ড গ্যাস জার্নালের তথ্যানুযায়ী, কাতারের প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের পরিমাণ ২৫.৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার যা বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের ১৫ শতাংশ! ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সর্ববৃহত্ গ্যাসক্ষেত্রে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন কিউবিক মিটার। ইরান এবং রশিয়ার পরে বিশ্বের অন্যতম গ্যাস রফতানিকারক দেশ কাতার। ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দার আঘাতে সুপার পাওয়ার আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির অর্থনীতি যখন ধরাশায়ী, তখন হুমড়ি খেয়ে পড়েনি কাতার। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে রিয়েলস্টেট সেক্টরে ধীরে চল নীতি গ্রহণ করার ফলে কাতার বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কালো গহ্বর থেকে মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে। কাতারের জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড ৩০ শতাংশ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে। আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের ধনবান দেশের তালিকার শীর্ষে রয়েছে কাতার। কাতারের মাথাপিছু জিডিপি এখন প্রায় এক লাখ ডলার ছুঁতে চলেছে। কাতারের জনসংখ্যা হল ১৮ লাখ, যার মাত্র ১.৮ শতাংশ (প্রায় ৩ লাখ) স্থানীয় কাতারী নাগরিক। অন্য একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কাতারের জনসংখ্যার এক দশমাংশ অর্থাত্ আনুমানিক ৩০ হাজার হচ্ছেন মিলিওনিয়ার! শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আরব দেশগুলির মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হল কাতার। ২০১২ সালের বিশ্ব শান্তি সূচকে ১৫৮টি দেশের মধ্যে কাতারের স্থান ১২। ভৌগলিক ও জনশক্তি বিচারে নিতান্তই একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হয়েও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পাওয়ার ব্রোকার হিসাবে কাতারের উত্থান সত্যিই বিস্ময়কর। কাতারের আল-জাজিরা টেলিভিশন মধ্যপ্রাচ্যের মিডিয়া জগতে রীতিমত বিপ্লব এনেছে। কাতারের উদার এবং আধুনিক ভাবমূর্তি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে যেমন সফল হচ্ছে তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর কাছেও কাতার একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাতারের উন্নয়ন কর্মসূচিঃ তেল ভান্ডার এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের কারণে ত্রিশ দশকের একটি ঘুমন্ত জেলেপাড়া দোহা, আজ প্রায় ১০ লাখ মানুষের একটি আধুনিক শহর। দোহা শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি, চলছে ভাঙ্গা-গড়ার খেলা, তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হাইওয়ে, উড়াল সড়ক, আর আকাশচুম্বী ভবন। দোহা শহরের আকাশচুম্বি দালানের সারি ধাঁধা লাগিয়ে দিচ্ছে সবার চোখে। সবাইকে ডিঙ্গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সেরা হবার জন্য উন্নয়নের সুপার-হাইওয়েতে ক্লান্তিহীন গতিতে ছুটে চলেছে কাতার। ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলকে মাথায় রেখেই তৈরি হচ্ছে কাতারের অবকাঠামো উন্নয়নের মাস্টারপ্ল্যান এবং দীর্ঘমেয়াদী কাতার ভিশন ফর ২০৩০। জুন-জুলাই মাসে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে। ওই সময় কাতারের তাপমাত্রা থাকবে ৫০ ডিগ্রির কাছাকছি। তবে স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরে তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড রাখা হবে বলে ফিফাকে গ্যারান্টি দিয়েছে কাতার। বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য নির্মিত হবে ১২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের ডিজাইন করছে জার্মানীর আর্কিটেক্ট আলবার্ট স্পিয়ার এন্ড পার্টনারস। স্টেডিয়ামের সৌর-শক্তি চালিত এবং কার্বন দূষণমুক্ত অভিনব শীততাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ডিজাইন করছে ব্রিটেনের অরুপ। কাতারের অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল বাজেট। আগামী বছরেই চালু হতে যাচ্ছে ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাতে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিয়ন যাত্রী উঠা নামা করতে পারবে। তৈরি হচ্ছে নতুন সমুদ্র বন্দর (১৫ বিলিয়ন ডলার), গভীর সমুদ্র বন্দর (৮ বিলিয়ন ডলার), ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দোহা মেট্রো (৭ বিলিয়ন ডলার), দ্রুতগতির বাস নেটওয়ার্ক, আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ১৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল লাইন (১১ বিলিয়ন ডলার) এবং বাহরাইন-কাতার সংযোগকারী ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ফ্র্যান্ডশিপ কজওয়ে’ (২৫ বিলিয়ন ডলার) ইত্যাদি। আভ্যন্তরীণ সড়ক এবং রেললাইন নির্মাণের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে যথাক্রমে ৩০ এবং ৪০ বিলিয়ন ডলার। অত্যাধুনিক কয়েকটি উপ-শহরে এডুকেশন সিটিতে রয়েছে আমেরিকার পাঁচটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাস। নির্মিত হচ্ছে অসংখ্য হোটেল। কাতারে ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদা এবং কর্মক্ষেত্রঃ কাতারে কর্মরত বাংলাদেশি বিএসসি ইনিঞ্জনিয়ারের সংখ্যা প্রায় দুইশ। এদের অর্ধেকেরও বেশি সরকারি এবং আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করছেন। অনেকে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কন্সাল্টিং প্রতিষ্ঠানেও কাজ করছেন। কেউ আবার নির্মাণখাতে নিজের ব্যবসা করছেন। কাতারের বেশ কিছু মন্ত্রণালয় ইঞ্জিনিয়ার রিক্রুট করার জন্য বিভিন্ন দেশে নিজস্ব প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে থাকে। তারা ওই সব দেশে সরাসরি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেন। কাতার ফার্টিলাইজার এবং স্টিল কোম্পানি, পানি ও বিদ্যুত্ সংস্থা, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইঞ্জিনিয়ার নেয়। যার সুবাদে ওইসব প্রতিষ্ঠানে এখন প্রচুর বাংলাদেশি প্রকৌশলী কাজ করছেন। যেমন কাতার ফার্টিলাইজার কোম্পানীতে ইঞ্জিনিয়ার (কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার), টেকনিশিয়ান সব মিলিয়ে ১০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতাঃ মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৌশলীদের চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদী চাকুরীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলে সৌদি আরব এবং কাতার এখন সবার শীর্ষে রয়েছে। তবে উদার সামাজিক ব্যবস্থার কারণে পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য কাতার, সৌদি আরবের চেয়ে বেশি উপযোগী। এছাড়া ভদ্রতা এবং নম্রতার বিচারে, মধ্যপ্রাচ্যে আরব আমিরাত এবং কাতারী নাগরিকদের বেশ সুনাম রয়েছে। কাতারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের সংখ্যা বেশি। তবে পেশাগত দক্ষতার জন্য কাতারে বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারদের যথেষ্ট সুনাম আছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতি কাতারের নীতিনির্ধারকদের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করছে। এছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়েও এখানে খুব একটা ভালো ইমেজ নেই। ফলে বাংলাদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার রিক্রুট করতে তারা দ্বিধান্বিত। কিছু দিন আগে কাতার গণপূর্ত দফতর থেকে একটি প্রতিনিধি দল ইঞ্জিনিয়ার রিক্রুট করতে গিয়েছিল ভারত, মালয়েশিয়া, এবং ফিলিপাইনে। প্রতিনিধি দল ভারতের মুম্বাই, দিল্লী এবং চেন্নাই শহরে গেলেও তাদের তালিকায় ছিল না বাংলাদেশের কোনো শহরের নাম। ভারতে যে দুর্নীতি নেই তা নয়, কিন্তু ভারত সরকার, দূতাবাস এবং ভারতীয় নাগরিকদের মিলিত প্রচেষ্টায় নেতিবাচত ধারণার দেয়াল ডিঙ্গিয়ে এরা সফলতা পাচ্ছে। বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি প্রবাসী হলেন দেশের প্রতিনিধি। প্রবাসে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বসেই আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি। কর্মক্ষেত্রে কোনো পদ খালি হলে কিংবা ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদার খবর জানতে পারলে তা অবহিত করে বাংলাদেশি প্রার্থীদের আমরা সহযোগিতা করতে পারি। তবে অনেক সময় আমাদের আত্মঘাতমূলক ভূমিকা কমিউনিটির অগ্রগতির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।