অনুমোদন সমাচার

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫২
সহযোগী একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হইয়াছে যে, গাজীপুরে এখন অনুমোদন ছাড়াই রাসায়নিক কারখানা স্থাপিত হইতেছে। এইজন্য বসুন্ধরা এলাকায় ফেরাস সালফেট তৈরির কারখানার দৃষ্টান্ত তুলিয়া ধরা হইয়াছে। লোহার বর্জ্য ও পাতলা সালফিউরিক অ্যাসিড আগুনে জ্বাল দিয়া তৈরি করা হইতেছে এই ফেরাস সালফেট। ইহা আয়রন সিরাপ ও বড়ির কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহূত হইয়া থাকে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কারখানার গ্যাসীয় ও তরল বর্জ্যের দূষণে আশেপাশের জমিতে শস্যের ফলন কমিয়া গিয়াছে। গাছপালা ও পুকুরের মাছ মরিয়া যাইতেছে ইত্যাদি। এই কারখানার অনুমোদন না থাকার বিষয়টি খোদ কারখানার মালিক স্বীকার করিয়াছেন। তবে তিনি যেই যুক্তি দেখাইয়াছেন, তাহা অতীব তাত্পর্যপূর্ণ। তাহার ভাষায়— ‘ এ জাতীয় কারখানার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না।’ কোন্ কোন্ শ্রেণীর কারখানার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগিবে নিশ্চয়ই তাহার বিধান রহিয়াছে। সেই অনুযায়ী ইহা তাহার মধ্যে পড়ে কিনা সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ভাবিয়া দেখিবেন। আমরা ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহত্ যে কোন শিল্প উদ্যোগের প্রতি অকুণ্ঠচিত্তে সমর্থন জানাই। কেননা তাহারাই হইতে পারেন আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স উভয় ক্ষেত্রে আমরা পরনির্ভরশীল। আমদানিনির্ভর পণ্যের ভিত্তিতে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান চলিতেছে বটে, তাহাতে দেশ মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। তাই দেশে সত্যিকার অর্থে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান বিকশিত হইতেছে না। বরং গত কয়েক বত্সরে আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছে। এমতাবস্থায় ছোট-বড় যে কোন শিল্পউদ্যোগকে আমাদের উত্সাহিত করা উচিত। কিন্তু ছোট-খাট কর্মউদ্যোগের জন্যও যদি অনুমোদন নিতে হয়, তাহা হইলে অর্থনীতির চাকা বন্ধ হইবারই জোগাড় হইবে। অবশ্য যেখানে জনস্বার্থ জড়িত সেখানে অনুমোদন ও তদারকির দরকার আছে বৈকি। এইজন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাহাদের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করিয়া যাইবেন তাহাতে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু আমাদের দেশে এই দায়িত্বশীলতারই অভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হইতেছে। পুরাতন ঢাকায় প্লাস্টিক বা রাসায়নিক কারখানায় প্রায় বত্সর কোন না কোন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পরই বলিতে শোনা যায় যে, কারখানাটির অনুমোদন নাই। এতদিন সরকারি কর্মকর্তারা কোথায় ছিলেন বা কী করিলেন সেই প্রশ্নও তখন চলিয়া আসে। প্রশাসনের নাকের ডগায় যখন কেহ অনুমোদন না নিয়া গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-কারখানা স্থাপন করে, তখন বিস্ময়ের সীমা থাকে না। প্রকৃতপক্ষে অনুমোদন বাণিজ্যও ইদানীং সীমাতিক্রম করিয়াছে। বলা যায়, মানুষের সহ্যের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। একটি সামান্য কাজের জন্য আজকাল সরকারি অফিসে বত্সরের পর বত্সর ঘুরিতে হয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এখানে তেমন কিছুই হয় না। আবার নগদ নারায়ণের ব্যাপার ঘটিলে মুহূর্তের মধ্যে কাজ হইয়া যায়। এই যখন সার্বিক পরিস্থিতি, তখন অনুমোদন নিয়া অনেকে ভাবিবার সময় পান না। আর অনুমোদনহীন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও এই কারণে না থাকিয়া পারে না। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের নানা অসংগতি, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা দেখিয়া ও শুনিয়া ক্ষেপিয়া উঠিয়াছিলেন। আমাদেরও এখন একই দশা হইয়াছে। যাহারা প্রায়শ পরিবেশ রক্ষার কথা বলেন, তাহারা উন্নয়নশীল বিশ্বে আর্থিক সংগতি সাপেক্ষে কিভাবে পরিবেশবান্ধব শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা যায়, সেই ব্যাপারে তেমন কোন পথনির্দেশ করেন না বলিলেই চলে। আর গাজীপুরের আলোচ্য কারখানাটি ভাড়া জমিতে গড়িয়া উঠিয়াছে। জমির মালিক যখন ইহাকে লাভজনক মনে করিবেন না বা এলাকাবাসীর মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হইবে, তখন এমনিতেই তাহা বন্ধ হইয়া যাইবে। কিন্তু ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে শুধু অনুমোদন নিয়া বাড়াবাড়ি না করাই শ্রেয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন