জামাত-শিবির ও বিএনপির সন্ত্রাসী এ্যাজেন্ডা এবং বাজার অর্থনীতির বদৌলতে আমাদের দেশে এখন চলছে ‘হরতালের’ পিলে চমকানো এক বিপজ্জনক খেলা।
একটি দেশে ‘বাজার অর্থনীতির’ আধিপত্য স্থাপিত হওয়ার স্বাভাবিক পরিণতি হলো সে দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রেও ‘বাজার’ সংস্কৃতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া। ‘বাজারের’ লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে ও তার উপাদান-উপকরণের দ্বারা যখন রাজনীতি চালিত হয়, তখন তাকে আখ্যায়িত করা যায় ‘বাজার রাজনীতি’ রূপে। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদান ও উপকরণের মতো রাজনীতিতেও ঘটে ঢালাও পণ্যায়ন (comoditification)। সবকিছু পরিণত হয় কেনা-বেচা ও লেন-দেনের সামগ্রীতে।
অর্থনীতির ও সেই সূত্রে রাজনীতির বাজারিকরণের ফলশ্রুতিতে রাজনীতিতে প্রধান হয়ে ওঠে বাণিজ্যিক সংস্কৃতি ও উপাদান। জন্ম নেয় নির্বাচন বাণিজ্য, নমিনেশন বাণিজ্য, দলীয় পদ বরাদ্দের বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য-সিট বাণিজ্য, অফিস আদালতে প্রমোশন বাণিজ্য-বদলি বাণিজ্য, নানা ধরনের তদবির বাণিজ্য ইত্যাদি। রাজনীতির পরিমণ্ডল হয়ে ওঠে এক ধরনের একটি ‘বাণিজ্যের সাম্রাজ্য’। এর পরিণতিতে রাজনীতির অঙ্গনেও ভোগবাদ, প্রদর্শনবাদ, দুর্বৃত্তায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ইত্যাদি প্রবণতা প্রধান হয়ে ওঠে। রাজনীতি পরিণত হয় এক ধরনের ফরমায়েসী বাণিজ্যিক প্রজেক্ট-এ। রাজনৈতিক তত্পরতার ক্ষেত্রে নীতি, আদর্শ, জনগণের ভূমিকা ইত্যাদি হয়ে ওঠে তুচ্ছ ও অবহেলার বিষয়। সেগুলো কেনা-বেচার মাল-মশলায় পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তত্পরতার জন্য যারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তারা হলো প্রমোটার ও লবিস্ট, ক্যাটারার ও কন্ট্রাক্টর, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা ও পাবলিক রিলেশন্স প্রতিষ্ঠান, ভাড়াটিয়া জনমত জরিপ ফার্ম ও কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান, তদবির সংস্থা ও এনজিও সাপোর্ট ইত্যাদি।
‘বাজার রাজনীতির’ এই খেলাকে গণতন্ত্রের লেবাস দেয়া হলেও সেখানে জনগণের ভূমিকা একেবারেই গৌণ ও প্রধানত পরোক্ষ। সেখানে জনগণের স্বাধীনভাবে কিছু করার নেই, তাদেরকে দিয়ে ‘করানো’ হয়। টাকা খাটিয়ে ও ছল-চাতুরীর সহযোগে, ইভেন্ট ম্যানেজার, পিআরও ও ভাড়াটিয়া মিডিয়ার সহায়তায়, জনমত ও জনগণের ভূমিকাকে ‘ম্যানেজ ও ম্যানুপুলেট’ করার ব্যবস্থা করা হয়। যে দল এসব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করতে পারে, ক্ষমতা চলে যায় তাদের হাতে।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতাও আসলে একটি ভুয়া প্রতিযোগিতা। কারণ, অর্থশক্তিসহ প্রতিযোগিতার অন্যান্য উপকরণকে কোন দল কতোটা ‘হাত করতে’ পারবে তা নির্ধারণ করে দেয় বিদেশি ও দেশি সেসব প্রভু, যারা বিশ্ব বাজার ও দেশের বাজারের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। এসব ‘সম্পদ’ কার হাতে বেশি পরিমাণে তারা সরবরাহ করবে, তার দ্বারা স্থির হয় জয়-পরাজয়। দেশি-বিদেশি ‘কর্তাদের’ অফিস রুমে বা ড্রইং রুমে অনুষ্ঠিত ‘আসল খেলোয়াড়দের’ বৈঠকে বসে নির্ধারিত হয় রাজনীতি সম্পর্কিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক তখন ‘বাজারী’ ব্যবস্থাদির সহায়তায় জনগণের ভূমিকা ম্যানুপুলেট করাসহ বুর্জোয়া রাজনীতির যাবতীয় খেলা মঞ্চায়িত হয়।
‘রাজনীতি হলো অর্থনীতিরই ঘনীভূত প্রকাশ’। যে ব্যবস্থা, মূল্যবোধ ও ভাবধারা দ্বারা অর্থনীতি পরিচালিত হয়, সেসবই রাজনীতিতে প্রধান প্রবণতা হয়ে ওঠে।
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার আগে পর্যন্ত উত্পাদন পরিচালিত হতো ‘ব্যবহারের’ জন্য। প্রথম দিকে সব উত্পাদন কাজই ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা গোত্রের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হলেও উত্পাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটায় এক সময় ‘বিনিময়ের’ জন্যও কিছুটা পরিমাণ উত্পাদন করা শুরু হয়। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘পণ্য’ (comodity) উত্পাদন প্রধান ধারায় পরিণত হয়। উত্পাদনের তাত্ক্ষণিক উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে ‘মুনাফা’ অর্জন—‘ব্যবহার’ বা ‘ব্যবহার নির্ভর বিনিময়’ নয়। মানুষের শ্রমশক্তিও একটি বিনিময়যোগ্য পণ্যে পরিণত হয় এবং তা হয়ে ওঠে ‘বাড়তি মূল্য’ জন্ম দেয়ার উত্স। এই বাড়তি মূল্য আত্মসাতের মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হতে থাকে মুনাফা। মুনাফার জন্য গলাকাটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পুঁজিবাদী পণ্য উত্পাদন ব্যবস্থা শুধু অর্থনীতিকে গ্রাস করেই ক্ষান্ত হয় না, তা সমাজের অন্য সব ক্ষেত্রকেই আবৃত করে ফেলে। সামাজিক সেবা কার্যক্রম থেকে শুরু করে এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কগুলো তার প্রভাবের বাইরে থাকতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির বাণিজ্যিকীকরণের প্রসার কত দূর পর্যন্ত ঘটেছে তার একটি নিদর্শন পাওয়া গেল গত ২৮ মার্চ ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি খবরে। ঐ সংবাদে জানানো হয়েছে যে, এখন পশ্চিমা দুনিয়ার দেশে দেশে ‘ভাড়াটিয়া বিলাপকারী’ পাওয়া যাচ্ছে। বিলাপকারীর চরিত্রে অভিনয়কারীদেরকে বলা হয় ‘মাইরোলজিস্ট’। ৪৫ পাউন্ড ফি-তে তারা ২ ঘন্টার জন্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদান, সেখানে প্রয়োজন মতো বিলাপ করা, প্রয়াত মানুষটির বন্ধু-বান্ধবের সাথে সহানুভূতির সাথে বাক্যালাপ করা ইত্যাদি ‘সেবা’ সরবরাহ করে থাকে। এই বিলাপকারী সরবরাহের ব্যবসা যুক্তরাজ্যেই প্রতি বছর ৫০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রাজনীতি করতে হলে সভা-সমাবেশ-মিছিল করতে হয়। পোস্টার-ব্যানার লাগাতে হয়। আমাদের দেশে এসবকে ঘিরেও রমরমা ব্যবসা চালু আছে। পোস্টার-ব্যানার লাগানো, চিকা মারা (দেয়াল লিখন) ইত্যাদি আগেই ব্যবসায়ী কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে। আজকাল সভা, মিছিলের জন্য ক্যাটারারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ‘মানুষ’ ভাড়া করার ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। কি ধরনের মানুষ চাই, সে অনুসারে সরবরাহের রেইট নির্ধারণ করা হয়। মিটিং-মিছিলে ‘মানুষ’ যোগান দেয়ার জন্য ‘রিস্ক এলাউন্সেরও’ ব্যবস্থা করতে হয়। একজন ক্যাটারারই হয়তো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেই ‘মানুষ’ সাপ্লাই দেয়, উভয়ের পোস্টার-ব্যানার লাগানোর কন্ট্রাক্ট নেয়। একই ব্যক্তি একবার এ দলের, অন্যবার অন্যদলের সভা-সমাবেশ-মিছিলে ‘মানুষ’ হিসেবে ভাড়া খাটে। বুর্জোয়া দলগুলোর তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পন্থা যদি এমন ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তাতে নীতি-আদর্শের উপস্থিতির কোনো সুযোগ থাকে কি?
আমাদের দেশে হরতাল হলো রাজনৈতিক তত্পরতার একটি প্রচলিত কর্মসূচি। গণআন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে হরতাল হলো একটি উঁচু পর্যায়ের পদক্ষেপ। প্রথমে অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত সংগঠিত করে, জনগণকে ক্রমে পক্ষে এনে, দাবি-দাওয়ার সপক্ষে আরো বেশি বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত ও সক্রিয় করে, একটা পর্যায়ে হরতালের কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনকে নতুন স্তরে উন্নীত করা হয়। এটিই হলো হরতালের ব্যাকরণ। এই ব্যাকরণ মেনেই সেই বৃটিশ আমল থেকে এদেশে হরতাল কর্মসূচি প্রচলিত আছে। পাকিস্তান আমলে ব্যাকরণ মেনে হরতাল কর্মসূচির উপযুক্তভাবে ব্যবহারের ফলে গণআন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করা সম্ভব হয়েছে। সে সময় কোনো মহল থেকে হরতালকে অপব্যবহার বা অতি ব্যবহার করে অবমূল্যায়িত করা হয়নি। গোটা আইউবী শাসনামলের এক দশকে ডজন খানেকের বেশি হরতাল করার প্রয়োজন হয়নি। তাতেই এক সময় দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে এবং আইউবকে বিদায় নিতে হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হরতাল আর তার আগের সেই চরিত্র ও মূল্য বহন করে না।
হরতালের অতি ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে শুরু হয় এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়। সে সময় জোটের অথবা লিয়াঁজো কমিটির বৈঠকে আন্দোলনের সম্ভাব্য কর্মসূচি সম্পর্কে আলোচনা উঠলে বেশিরভাগ সময় অধিকাংশ দল বলতো ‘অতো খাটনি করা যাবে না। সহজ কর্মসূচি নেয়া হোক। হরতাল ডেকে দেয়া হোক’। অর্থাত্ হরতাল হলো সহজ কর্মসূচি—আর সমাবেশ, পদযাত্রা, ঘেরাও ইত্যাদি হলো কঠিন কর্মসূচি। বস্তুতঃ সে সময় থেকেই হরতালকে ‘সহজ কর্মসূচিতে’ পরিণত করা হয়েছিল। হরতালের প্রস্তুতি কাজ ও তার চেহারা বদলে দেয়া হয়েছিল। হরতাল ডেকে দিয়ে আগের দিন সন্ধ্যায় কিছু ককটেল ফুটানো হতো। একে বলা হতো ‘সাউন্ড এফেক্ট’। দক্ষ ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে ‘সাউন্ড এফেক্টের’ ব্যবস্থা করা হতো। তারপর হরতালের দিন প্রচারের উদ্দেশ্যে সকালে একটি মিছিল ও দিন শেষে হরতাল ‘সফল’ করার জন্য জনগণকে অভিনন্দন জানিয়ে সমাবেশে বক্তৃতা করেই কাজ শেষ। আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্তি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ুক বা কমুক, হরতাল আহ্বানকারীদের জন্য সেটি কোনো মাথা ব্যথার বিষয় ছিল না।
বর্তমানে ‘হরতালের’ হালচাল আরো অধঃপতিত হয়েছে। গত নভেম্বর মাস থেকে জামাত-শিবির এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট দেশে ক্রমাগত ‘হরতাল’ করে চলেছে। তথাকথিত ‘হরতালের’ এসব কর্মসূচিতে দলীয় ক্যাডার বলে কথিতদের সক্রিয়তা থাকলেও জনগণের সম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণ মোটেও বাড়েনি। ক্যাডারদের হরতাল ডিউটি হলো গাড়ি পুড়ানো, ক্র্যাকার ফাটানো, যানবাহন ভাঙচুর করা, টায়ারে আগুন দেয়া, গাছ কেটে রাস্তায় ফেলা, রাস্তা কাটা, নানাভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ইত্যাদি। তাছাড়া, রেল গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, রেল স্টেশনে হামলা-আগুন দেয়া, রেল লাইন উপড়ে ফেলা ইত্যাদি অপারেশন চালানো। এসব কাজের জন্য ভাড়াটিয়া লোক পাওয়া যায়। সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, ককটেল ফাটানোর জন্য ১ হাজার টাকা, গাড়ি ভাঙচুরের জন্য ৫ হাজার টাকা, গাড়িতে আগুন দেয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা দিলে ফরমায়েস মতো কাজ হাসিল করার লোক পাওয়া যায়। বিএনপি-র টাকা অনেক। জামায়াতের তো টাকার কোনো অভাবই নেই। তাই, ককটেল ফুটছে, ভাঙচুর হচ্ছে, আগুন লাগছে। হরতালের নামে এসব কাজ হলেও জনগণের জন্য সে সবের মধ্যে পড়ে ভীত-সন্তস্ত্র হয়ে থাকা ছাড়া অন্য কিছুই করার নেই। এসব ‘হরতাল’ মানুষকে সক্রিয় হওয়ার জন্য আকৃষ্ট করার বদলে তাদেরকে আরো দূরে ঠেলে দেয়।
নভেম্বর থেকে পুলিশকে টার্গেট করে আক্রমণ, বিজিবি ও পুলিশের গাড়িতে হামলা, থানায় হামলা, সরকারি অফিস তছনছ, বিদ্যুত্ কেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি যুদ্ধংদেহী কাজকর্মও করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০ জন পুলিশকে বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে, ৬ জন গাড়ির চালককে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হামলা করে হতাহত করা হয়েছে। গত পাঁচ মাসে ৪০০ বাস-ট্রাকে আগুন ও ৩০০০ যানবাহন ভাংচুর করা হয়েছে। ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টির জন্য দেশব্যাপী বর্বর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, তাদের দোকানপাট, বাড়িঘরে হামলাবাজি এখনো চলছে। একটি হিসেব থেকে দেখা যায় যে, গত এক মাসে ইতিমধ্যে দেশের ৩২টি জেলায় ৭১টি মন্দির, ৯৬টি হিন্দু বাড়ি ও সংখ্যালঘুদের ১৫২টি দোকানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ অনুপাতের অতিরিক্ত মাত্রায় গুলি চালিয়েছে। পুলিশী হামলায় প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘হরতালের’ কর্মসূচিতে হরতালের নামগন্ধ নেই। তাকে রাষ্ট্রের সাথে সামরিক কায়দার জঙ্গি সংঘাতের অপারেশনে পরিণত করা হয়েছে।
হরতালের উদ্দেশ্য যদি হয় গণআন্দোলন, এবং গণআন্দোলনের প্রসারের অর্থ যদি হয় তাতে আরো বেশি মানুষের সম্পৃক্তি ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা, তাহলে গত ৫ মাস ‘হরতালের’ নামে যে কর্মসূচিগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে সেগুলোকে মোটেও হরতাল বলে চিহ্নিত করা যায় না। জনগণকে আন্দোলনে টেনে আনার বদলে এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য দেশে কোনোভাবে একটি ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করা। সেরূপ ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টির জন্য প্রথমতঃ রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোকে নড়বড়ে করে দিয়ে একটি অস্থিরতা তৈরি করা ও দ্বিতীয়তঃ জনগণের মনে একটি সন্ত্রস্ত ‘টেররাইজড মনস্তত্ত্ব’ তৈরি করার লক্ষ্যে যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে ও হচ্ছে। এই কর্মকাণ্ডকে কোনোভাবেই হরতাল বলে আখ্যায়িত করা যায় না। এগুলো হলো নিছকই প্রশিক্ষিত ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত ‘সংগঠিত সন্ত্রাসী অপারেশন’।
যে কর্মসূচিকে আমরা বিশুদ্ধ হরতাল বলে আখ্যায়িত করতে পারি তাতে যে মোটেও কোনো সহিংসতা ঘটে না, তেমনটি নয়। প্রকৃত হরতালে কিছু সহিংসতা থাকলেও তাতে জনগণের সম্পৃক্তি ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ‘হরতাল’ নামে এখন যা ঘটানো হচ্ছে তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহিংস সন্ত্রাস। জনগণের সম্পৃক্তি ও সক্রিয়তা বৃদ্ধির বিষয়টি এক্ষেত্রে শুধু তুচ্ছ বলেই বিবেচিত নয়, বরঞ্চ তার ফলাফল দাঁড়ায় জনগণকে ‘টেরোরাইজ’ করে গণআন্দোলন থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেয়া। এই চরিত্রের কারণে বর্তমানে জামায়াত-শিবির ও ১৮-দলের কর্মসূচিকে হরতাল না বলে ‘সংগঠিত সন্ত্রাসী অপারেশন’ বলে চিত্রায়িত করাই যুক্তিযুক্ত। ঝাউ বাগানে কিছু কচু গাছ থাকলেও সেটিকে ঝাউ বাগান বলতে কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু কচু ক্ষেতে দু’একটি ঝাউ গাছ থাকলেও তাকে ঝাউবন বলে আখ্যায়িত না করে সবাই তাকে কচু ক্ষেতই বলবে। এদের ‘হরতালকে’ তাই কোনোভাবেই হরতাল বলে আখ্যায়িত করা যায় না।
এ সময়কালে সিপিবি-বাসদ-বামফ্রন্ট ডিসেম্বরে ও জানুয়ারিতে দু’টি সফল হরতাল করেছে। এই হরতাল দু’টিতে গাড়িতে আগুন লাগানো হয়নি, ভাঙচুর হয়নি, একটি ঢিলও ছোঁড়া হয়নি, কোনো সন্ত্রাস হয়নি। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে হরতাল সফল হয়েছে। দ্বিতীয় হরতালের দিন পুলিশ ‘পিপার স্প্রে’, ‘জল কামান’ ইত্যাদি প্রয়োগ করেও হরতালে জনগণের অংশগ্রহণ রোধ করতে পারেনি। এই হরতালের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ ও গণচেতনা ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ চত্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অভূতপূর্ব গণজাগরণ আন্দোলন জন্ম নেয়ার পটভূমি রচনায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
এ ধরনের হরতাল করার সক্ষমতা, ইচ্ছা বা প্রয়োজনীয়তা কোনোকিছুই জামায়াতের নেই। বিএনপিরও তা সামান্যই আছে। ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করাটাই জামায়াতের লক্ষ্য, অন্যদিকে বিএনপির জন্য বড় ইস্যু হলো যেনতেন উপায়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রুদ্ধ করা। সে জন্য দেশ অচল করে দিয়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক দেশি-বিদেশি কতৃত্ববাদী মহলকে এটি দেখানো যে, আওয়ামী লীগকে দিয়ে দেশ চালানো সম্ভব হবে না। এসব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যাকরণসিদ্ধ হরতাল অপ্রয়োজন। প্রয়োজন ‘সংগঠিত সন্ত্রাসী অপারেশন’। ‘হরতালের’ নামে জামায়াত ও বিএনপি সেটাই করছে।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
