[ রা জ নী তি ]

সমঝোতা না সংঘাত

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১০
সংলাপের বিষয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই আলোচনার প্রক্রিয়াটি এতই জটিল চরিত্র লাভ করেছে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আদালতে আইনি ভাষায় কোনো বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত। কিন্তু রাজনীতি হলো ক্ষমতা সম্পর্ক এবং এই ক্ষমতা সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বোঝাপড়ার বিষয়। তাই আদর্শিক অর্থে নয় বরং বাস্তব অর্থেই রাজনীতি হলো একটি বৃহত্তর রাজনীতির পরিবেশে বিদ্যমান সকল গোষ্ঠীর বোঝাপড়ার বিষয়। এই বোঝাপড়ায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর আচরণ কখনো মৌখিকভাবে অসহিষ্ণু হয় এবং কখনো দৈহিকভাবে অসহিষ্ণু হয়। দীর্ঘ ও জটিল সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোতে এই বোঝাপড়ায় বিদ্যমান অসংগতিগুলো বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশের উপাদানগুলোর মৌখিক প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু উন্নয়নশীল সমাজে এই মৌখিক প্রকাশ শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতেও প্রকাশিত হয় যা রাজনৈতিক সমাজে এমনকি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সাধারণ সামাজিক অংশেও সহিংসতাকে এগিয়ে নেয়। এই জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমাজ ও রাজনীতি পরিবর্তনের ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক বিষয়ে এমনকি রাজনৈতিক সংলাপের বিষয়েও নির্দেশনার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার ব্যাপারে আবেগতাড়িত করতে পারে। তাছাড়া, এই সহিংসতার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নের নৃতাত্ত্বিক মডেলের ভুল প্রয়োগ হতে পারে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সংলাপ ও সহিংসতা বিশ্লেষণে এই প্রতিষ্ঠানের আশ্রয় গ্রহণ রাজনৈতিক পরিবেশে ক্রিয়াশীল অনুঘটকগুলোর আচরণ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণী ক্ষমতার দেউলিয়াত্বেরই প্রকাশ। এখানে একটি রাজনৈতিক সমাজের বুদ্ধির সংকটও প্রতীয়মান। এর ফলে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক অনুঘটকগুলোর অক্রিয়াশীলতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নেতৃত্বদানের অভাব রাজনৈতিক সমাজকে আইনের আশ্রয় করে এবং সমস্যা সমাধানে আইনী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। একইভাবে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের পরিবর্তে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানী অথবা রাজনৈতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণে ভাসাভাসা জ্ঞান রয়েছে এমন বুদ্ধিজীবীদের পদচারণমুখর হয়ে উঠে। যার ফলে রাজনৈতিক সহিংসতার সঠিক কারণ নির্ধারণ করা যায় না এবং সহিংসতাকে বোঝাপড়ায় পরিণত করার জন্য কার্যকর মীমাংসাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে সমাজের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এই সংকট ও সংকট সমাধানের পদ্ধতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকলেও তা প্রায়োগিক না হওয়ায় রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পরিবেশের অনুঘটকগুলো ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে। বাংলাদেশে সম্ভবত তাই হচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক সংকটের উত্স খুঁজতে এবং সমাধানের লক্ষ্যে সমাজের অরাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো এবং রাজনীতি বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত ব্যুত্পত্তি অর্জনকারীদের বাইরের লোকদের আনাগোনাই বেশি লক্ষণীয়। তাই এই সংকটের উত্পত্তি ও সমাধান খুঁজতে হলে মূলধারার মিডিয়ায় প্রচারিত ও প্রকাশিত না হলেও যাদের সত্যিকার অর্থেই রাজনৈতিক বিষয়াদি বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ রয়েছে তাদের শরণাপন্ন হতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে তাই হয়। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, সাহিত্য, ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ে ব্যুত্পত্তি অর্জনকারীদের শরণাপন্ন হলে হবে না। তাদের পক্ষে রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নিজের মতামত প্রকাশ সম্ভব কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রদান সম্ভব নয়। তাই তাঁরা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দাওয়াই দেয় যা সমাজ ও রাষ্ট্রকে অধিকাংশ সময়েই ভুল পথে পরিচালিত করে। তথাকথিত সুশীল সমাজের লোক হলেই কেউ রাজনৈতিক বিষয়াদিতে ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম এই ধারণা একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশারই প্রমাণ। রাজনৈতিক সংকটকে উত্তরণের জন্য এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটকেও কাটিয়ে উঠতে হবে। অন্যথায় এই সংকট সমাধানের পদ্ধতি কাল্পনিক ও আদর্শিক হবে যা শুধু মধ্যযুগীয় নয় প্রাচীন গ্রিসীয় চরিত্রের হবে। গোষ্ঠী ধারণায় ব্যাখ্যা দিলে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট গোষ্ঠীগত স্বার্থের লড়াই। এই লড়াই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ উভয় জায়গায় বিদ্যমান। কিন্তু লড়াইয়ে লিপ্ত গোষ্ঠীগুলোর চরিত্রে পার্থক্য রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে এই লড়াইয়ে সংগঠিত স্বার্থ জ্ঞাপনকারী ও অসংগঠিত স্বার্থ জ্ঞাপনকারী গোষ্ঠীগুলো বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। অর্থাত্ সেখানে রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী দলগুলো রাজনৈতিক কাঠামোতে নিজেদের স্বার্থকে বেশি পাওয়ার জন্য লড়াই করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই লড়াইয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীগুলো (যেমন সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র) ও তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠী (যেমন বিএনপি আমলের কানসাট, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, শাহবাগ ও শাপলা চত্বর) বেশি ক্রিয়াশীল থাকে। উন্নত দেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সংগঠিত ও অসংগঠিত গোষ্ঠীগুলো স্বার্থজ্ঞাপন করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে তা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে না। প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীগুলো জনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করে এবং তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলো অরাজনৈতিকভাবে জনতার দাবিগুলো নিয়ে আসে যা চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রবিষ্ট হতে সক্ষম হয় না এবং হলেও চরিত্র বিকৃত হয়। তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলো প্রাথমিকভাবে মৌখিক সহিংসতায় লিপ্ত হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সংঘাতে লিপ্ত হয় (যেমন ৬ এপ্রিল)। একটি পর্যায়ে এই তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত দেউলিয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে চলে আসে (যেমন শাহবাগকে আওয়ামী লীগের সমর্থন দান এবং শাপলাকে বিএনপি’র সমর্থনদান) এবং ব্যাপক সংঘাত তৈরি হয়। শাহবাগ বাঙালিত্বের পরিচয় এবং শাপলায় অন্য পরিচয়ে তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত রাজনৈতিক দলের সাথে একত্রীকরণ হয় শুধু পরিচয়কে গায়ে মাখানোর জন্য নয় বরং সেই পরিচয়ের পোশাকের নিচে লোকায়িত পুঁজিতান্ত্রিক স্বার্থ ও সামাজিক মর্যাদার অন্তরালেই। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্রিয়াশীল দুই জোট বাঙালিত্ব ও ভিন্ন পরিচয়ের আড়ালে পুঁজিতান্ত্রিক স্বার্থ ও সামাজিক মর্যাদার নানা স্তর তৈরি করেছে, যা সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণি থেকে চৌকিদার পর্যন্ত বিস্তৃত। তার কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। আওয়ামী লীগ ও চৌদ্দ দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলে বাঙালিত্ব পরিচয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য নেতৃত্ব দেয় এবং সরকারি ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সরকারি লাইসেন্স থেকে শুরু করে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বে-আইনিভাবে ঋণ গ্রহণ, আমদানি-রপ্তানির সরকারি কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে রাষ্ট্রিক সুযোগকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, যার ফলে বেআইনিভাবে পুঁজির প্রাথমিক সংগ্রহ সম্ভব হয়। অন্যদিকে, বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসলে ভিন্ন পরিচয়ে সুবিধা পায় এবং একই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে পুঁজির প্রাথমিক সংগ্রহ তৈরি করে। কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে উভয় জোটের ক্ষমতায় থাকাকালে উভয় জোটকে একে অপরের মাধ্যমে নিগৃহীত হতে হয় এবং এই নিগ্রহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলকেও গ্রাস করে। এই অবস্থা সামাজিক (সমাজের নেতৃত্বদান) সাংস্কৃতিক (মিডিয়ায় বাজার দখল ও অন্যান্য) পেশাবৃত্তি (কিছু অফিসার ও.এস.ডি. কিছুর দ্রুত প্রমোশন ও শীর্ষ পদে আরোহণ) ইত্যাদি ক্ষেত্রে কারোর অস্তিত্বহীনতাই কারোর অস্তিত্বকে বাস্তব করে তোলে। আর তাই তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলো যে পরিচয়ে আসুক না কেন কখনো নেপথ্যে কখনো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাকে নেতৃত্ব দিবে এবং তাত্ক্ষণিক গোষ্ঠীগুলোর আন্দোলনের ফসল নিজের ঘরে তোলবেই। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটের চরিত্র এটাই। যেখানে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি স্বীয় স্বার্থ রক্ষায় যে কোনো জোটের পরিচয়ে কাজ করে এবং একের অস্তিত্ব অন্যের বিনাশের উপর নির্ভর করে (এমনকি ঠিকাদারি ব্যবসায়ও) সেখানে এই স্বার্থ বণ্টনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক মীমাংসা ছাড়া আদালতের দিক নির্দেশনায় আলোচনায় বসলেও সংঘাতকে বর্জন করতে পারবে না। তাই সংঘাত হলো এখানে প্রায়োগিক এবং আলোচনা হলো আদর্শিক। তবে গত চল্লিশ বছরে আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার এমন আবহ তৈরি হওয়ার কথা ছিল যার ফলে এদের মধ্যে স্বার্থের বণ্টন আইনি হতে পারতো; তা হয়নি। এই অবস্থায় যারা সমঝোতা চায় তাদের উদ্দেশে বলতে চাই নৃতাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মডেল এখানে প্রয়োগ করবেন না। এই সংঘাত রাজনৈতিক। স্বার্থের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয় দুই ক্ষেত্রে। প্রথমত, যখন উভয়ই গোষ্ঠীই অস্তিত্বহীনতায় ভোগে। তাই ১৯৯০ সালে বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ২০০৭-২০০৮ সালেও একই ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয়ত, বিবদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে কোনটি প্রচণ্ড পরিমাণ দুর্বল হয়ে পড়লে সমঝোতা হয়। এই চেষ্টা ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে চার দলীয় জোট করেছে এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে করছে। চারদলীয় জোট ২০০১-২০০৬ সালে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ১৪ দলীয় জোটের বিষয়ে এখনো বলা যায় না। তাই ১৪ দলীয় জোটের সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং ১৮ দলীয় জোটের রাজপথের আন্দোলনের মিথস্ত্রিয়ায় এর ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হবে। পৃথিবীর সকল রাজনৈতিক সমাজই এই বৃত্ত পাড়ি দিয়েছে। আমাদেরকেও দিতে হবে। এটাই প্রায়োগিক। লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইমেইল :[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন