মুশফিকুর রহিমের বুকটা কী ধুকপুক করছে?
করতেই পারে। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম জিম্বাবুয়ে সফরে স্বাগতিকদের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে টস করতে নামার আগে একটু নার্ভাস হলে তাতে দোষের কিছু নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলা মানেই বাড়তি একটা চাপ—অ্যাশেজের মতো, ভারত-পাকিস্তান সিরিজের মতো চাপ! চাপের স্বরূপটা বুঝতে মুশফিক একটা ইতিহাস মনে রাখতে পারেন, এই জিম্বাবুয়ে সফরে খারাপ ফলাফল করে দেশে ফিরে অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন এ পর্যন্ত দু’জন বাংলাদেশি অধিনায়ক—সাকিব আল হাসান ও নাঈমুর রহমান দুর্জয়!
এটা ঠিক যে বাংলাদেশের দুই যুগের অন্যতম সেরা দুই অলরাউন্ডার সাকিব ও দুর্জয়ের অধিনায়কত্ব হারানোর নেপথ্যে আরো অনেক ব্যাপার ছিল। তবে দৃশ্যত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাজে পারফরম্যান্সই তাদের চাকরি হারানোর কারণ। মুশফিক নিজে অন্তত সাকিবের ব্যাপারটা তো ভালোই জানেন। সর্বশেষ সফরেই অপ্রত্যাশিতভাবে জিম্বাবুয়ের প্রত্যাবর্তন টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ হেরে যাওয়ার পরই সাকিবকে সরিয়ে এই মুশফিককে অধিনায়ক করা হয়েছিল।
ফলে নিকট অতীতের সেই ইতিহাস মাথায় রেখে হলেও মুশফিককে আজ তার ক্যারিয়ারের সম্ভবত বৃহত্তম চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে মুশফিক নিজেই এই চ্যালেঞ্জটা একদিন ভালো বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জিতলে আমরা খুব প্রশংসা পাবো না, কিন্তু হারলে সবাই সমালোচনা করবে। এটাই আসল চ্যালেঞ্জ।’
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ এরকম উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে আসলে ২০০৫ সাল থেকে; তাদের সোনালী প্রজন্মের বিদায়ের পর। ২০০৪ সালেও বাংলাদেশের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ সিরিজে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ছাড়া বাকি সব তারকারাই ছিলেন। ফলে ২০০৫ সালের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৬টি ওয়ানডে খেলে বাংলাদেশ মাত্র ১টি জয় পেয়েছিল। সেই চিত্রটাই বদলে গেল ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বাংলাদেশ সফরে। সেবার সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে এসে দলটির বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।
ক্রীড়ানুরাগিরা মনে করতে পারেন, সিরিজের শেষ সেই তিন ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে সিরিজও জিতেছিল। সেই থেকে সর্বশেষ ৪০টি ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৯টি ম্যাচেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্টের চিত্রটাও প্রায় একইরকম। সোনালী প্রজন্ম থাকতে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৬টি টেস্ট খেলে দু’টি বৃষ্টিবিঘ্নিত জয় এবং চারটি হারের মুখ দেখেছিল। ২০০৫ সালে এসে সেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ ও সিরিজ জিতল।
এ পর্যন্ত পড়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত হওয়া যায় যে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এখন আর সেই ‘জুজু’টা বাংলাদেশের থাকার কথা নেই। সেই অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, গ্রান্ট ফ্লাওয়াররা অনেক আগেই চলে গেছেন। তারপর থেকে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে শুধু গোলমাল আর গোলমাল। এসব গোলমালে চার বছর টেস্ট থেকে দূরেও থেকেছে তারা। একসময়ের দাপুটে দল থেকে তলানির দলে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ এই সিরিজে সব খেলোয়াড়কে খেলতে রাজি করাতেও বেগ পেতে হয়েছে সে দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে।
তাহলে কেন এখনও বাংলাদেশের এই নার্ভাসনেস? কেন এখনও মুশফিকের বুক কাঁপে?
কারণ, সর্বশেষ সিরিজটা। একেবারেই ফেবারিট হিসেবে বাংলাদেশ ২০১১ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়েছিল। কিন্তু চার বছর পর টেস্টে ফেরা জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশকে যেন আকাশ থেকে পেড়ে আনল। এক মাত্র টেস্টে জিতল তারা, জিতল ওয়ানডে সিরিজেও।
আর সেই ইতিহাসে চেয়েও যা কিছু শঙ্কা বাংলাদেশের। হ্যা, শঙ্কা উড়িয়ে দেয়ার কারণই বেশি। সেই ২০১১ সালের পর থেকে জিম্বাবুয়ের পারফরম্যান্স দিনকে দিন আরো খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশ এই সময়ে নিজেদের আরো শক্তিশালী দল হিসেবে প্রমাণ করেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওয়ানডে সিরিজ হারিয়েছে এবং সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় অসাধারণ এক সফর শেষ করে ফিরেছে। এই সময়ে বাংলাদেশের স্কোয়াডে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের মতো পরীক্ষিত পারফরমারদের সঙ্গে নাসির হোসেন, মোমিনুল, সোহাগের মতো তরুণ-নির্ভরশীল পারফরমার যোগ হয়েছেন; ফর্মে ফিরেছেন আশরাফুলও।
ইতিবাচক যুক্তির শেষ নেই। এখন দেখার বিষয় এসব ইতিবাচক ব্যাপার মাঠে কী ভূমিকা রাখে।
