নগরীজুড়ে সড়ক দ্বীপগুলোর লাইট পোস্টে এখনো ঝুলছে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের প্ল্যাকার্ড। এখনো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বাইরের অংশে নির্বাচনী পোস্টার, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচারপত্র ঝুলছে! এসব দেখে কারো অনুমান করারও উপায় নেই যে, আজ কাগজে-কলমে অন্তত দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া আসরটির পর্দা উড়তে যাচ্ছে!
অনুমান করতে পারুন আর নাই পারুন, আজ জমকালো এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে যাবে অষ্টম বাংলাদেশ গেমস। আতশ বাজি পুড়বে, আলোর খেলা হবে, গান-বাজনা-মার্চপাস্টে নেচে উঠবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। ভেতরে ভেতরে যত দীনতাই থাকুক না কেন, আজ আলোর মুখ দেখবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মিলন মেলা।
এই মিলন মেলা শুরুর আগেই কয়েকটি প্রশ্ন অনেক বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ক্রীড়াবিদদের অপ্রাপ্তি, প্রস্তুতির অভাব, তাড়াহুড়া, অসময়ে গেমস; এসব প্রশ্ন তো আছেই। শেষ বেলায় এসে দেখা গেল প্রচারের অভাবটাও খুব বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
২২ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় মাপের এই আয়োজনের কথাটি সাত দিন আগেও এদেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা জানতে পারেননি। সেভাবে প্রচার নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও বিওএ’র কর্মকর্তাদের বলেছিলেন প্রচার বাড়াতে। সেটা পারেননি তারা।
তবে এসব না হওয়া ব্যাপার সঙ্গে নিয়েই এখন চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিল্পীরা। বিকাল চারটা থেকে অনুষ্ঠান শুরু। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা সন্ধ্যা সাতটায়। এই গেমসে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই যেন সব আয়োজন। উদ্বোধনীতে ব্যয় আট কোটি টাকা।
গেমসে খেলোয়াড়দের উন্নতি কিংবা প্রতিভাবানদের তুলে আনার কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায়নি আয়োজক বিওএ’র কাছ থেকে। এই মুহূর্তে তাদের কাছে আয়োজনটাই বড় ব্যাপার। কতটুকু সফলতা আর কতটুকু ব্যর্থতা আসবে তা নিয়ে এখনই ভাববার প্রয়োজন নেই কর্মকর্তাদের কাছে। তাদের যুক্তি—এগার বছর গেমস বাক্স বন্দী ছিল; এবার থেকে অন্তত আয়োজনটা নিয়মিত হলে সমস্যাও কেটে যাবে।
কিন্তু এতো তড়িঘড়ি করে কেনই বা এমন আয়োজন? যাদের জন্য খেলা, সেই ক্রীড়াবিদরা যদি প্রস্তুতি নেয়ার সময়ই না পায় তাহলে কার জন্য গেমস? এমন প্রশ্ন উঠেছে বার বার। বিওএ’র জবাব একটাই, ‘এক্ষুণি গেমস হওয়া দরকার।’
গেমসটা হচ্ছে অসময়ে। ঝড়-বাদলের সময় গেমস হয় না। শীত মৌসুমটাই শ্রেয়তর। দেশের রানৈতিক পরিস্থিত ভালো না। এমন সময় জেলা থেকে ক্রীড়াবিদরা এসেছেন পরিবারের অমতে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। চলছে এইচএসসি পরীক্ষা। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ক্রীড়া উত্সব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। টেলিভিশনের সামনে বসারও সময় পাবেন না।
এটা সত্যি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দুই মাস আগে ঘোষণা দিয়ে গেমস আয়োজনের নজির নেই কোথাও। খেলোয়াড়দের তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেই সময় পাননি ক্রীড়াবিদরা। যে কারণে ইনজুরি হওয়ার আশংকাও রয়েছে এবার। ২০১০ সালে ঢাকায় এসএ গেমসে ১৮টি স্বর্ণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। এর কারণ ১৩ মাস তালিম নিয়েছিলেন ক্রীড়াবিদরা।
খুব নির্দয় হয়ে বললে বলতে হয়, এই বাংলাদেশ গেমস আর ফেডারেশনগুলোর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের আদলেই গেমসটা হচ্ছে। পার্থক্যটা শুধু এখানে সব খেলাই নির্ধারিত সময় শেষ করতে হবে। আর এর জন্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। সরকারের শীর্ষমহলকে আয়োজক কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত করে অর্থ সংগ্রহ করে গেমসটা আয়োজনের জন্য আয়োজন। অথচ খেলোয়াড় তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৭৮ সালে প্রথমবার অলিম্পিক গেমস নামে শুরু হয়েছিল এই খেলাটি। দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। তত্কালীন সময় দর্শক ভিড়ে ঢাকা স্টেডিয়াম এলাকায় পা ফেলার জায়গাটুকু ছিল না। সেই ছবিটার সাথে আজকের বাংলাদেশ গেমসের ছবিটার কোনো মিল নেই।
সময়ের পরিক্রমায় ১৯৮৩ সালে অলিম্পিক শব্দটি ছেঁটে ফেলে নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ গেমস। ২০০২ সালে শেষ বার অনুষ্ঠিত হয় এটি। এগার বছর পর বাংলাদেশ গমসের অষ্টম আসর আজ শুরু হতে যাচ্ছে। খেলার জন্য খেলা।
এতোকিছু সমালোচনার পরও একটা কথা স্বীকার করতেই হয়, ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ গেমস নিয়ে অন্তত উত্সাহের অভাব নেই। ক্রীড়াবিদ, কর্মকর্তা, দর্শক সবাই আসলে দিনশেষে মাঠে খেলা দেখতে চান। যেকোনোভাবেই হোক মাঠে খেলা থাকুক।
আমরাও তাই বলি, খেলা হোক। ভালো কিছু হোক। ক্রীড়াঙ্গনে মিলন মেলা হোক। শুধু পদকের লড়াই নয়, সত্যিকারের খেলায় মেতে উঠুক বাংলাদেশ।
