জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটেছে বেশ অনেকদিন আগে। সেই দলের গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, হিথ স্ট্রিক, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলরা এখন দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের হয়েই বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন; অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার আছেন ইংল্যান্ডের দলের প্রধান কোচ হয়ে। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাঙ্গন সুযোগ পেলেই সেই দিনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্ন—আবার ফিরে আসবে ফ্লাওয়ারদের সেই যুগ।
এক অর্থে গতকাল হারারে টেস্টের চতুর্থদিনে সেই ‘ফ্লাওয়ারদের যুগ’ ফিরেই এলো। না, মাঠের বাইরের দায়িত্ব ছেড়ে খেলতে নামেননি ফ্লাওয়ার ভাইয়েরা। তারপরও সেই যুগের এক রেকর্ড মাঠে ফিরিয়ে আনলেন অধিনায়ক ব্রেন্ডন টেলর। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারের পর জিম্বাবুয়ের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে এক টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরি করলেন টেলর। এক ধাপ এগিয়েও গেলেন তিনি—জিম্বাবুয়ের হয়ে প্রথম কোনো অধিনায়ক হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন তিনি।
আর কার্যত এই টেলরের জোড়া সেঞ্চুরির কাছেই লজ্জাজনকভাবে, প্রাগঐতিহাসিক কালের ভঙ্গিতে হারারে টেস্ট হেরে গেল বাংলাদেশ। টেলর একা দু’ ইনিংসে রান করলেন ২৭৩; ১৭১ ও ১০২*। বাংলাদেশের সব ব্যাটসম্যান মিলে দু ইনিংস মিলিয়ে টেলরের চেয়ে মাত্র ৮ রান বেশি করতে পারলেন! ফলে ৩৩৫ রানের পর্বতসমান রানের ব্যবধানে হেরে মাঠ ছাড়তে হল মুশফিকদের।
বাংলাদেশের, মুশফিকের জন্য এইসব রেকর্ড হতে পারে অত্যন্ত লজ্জার। কিন্তু জিম্বাবুয়ের জন্য এই টেস্ট এমনিতেই রেকর্ড বইয়ে বাঁধিয়ে রাখার মতো এক টেস্ট। আর অধিনায়ক হিসেবে টেলরের জন্য ক্যারিয়ারের সেরা টেস্ট তো বটেই। অধিনায়ক হলেই সেরা পারফরমার—জিম্বাবুয়ের এই যে রীতি, জোড়া সেঞ্চুরি করে তা আরও শক্ত করে প্রতিষ্ঠিত করলেন টেলর।
টেস্টে মাত্র তিনবারই এই জোড়া সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছে জিম্বাবুয়ে। কাকতালীয় ভাবে, তিনবারই এই ঘটনার সাক্ষী হারারে স্পোর্টস ক্লাব। ১৯৯৭ সালে প্রথম গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই প্রথম কীর্তি গড়েন। সেটি আবার ছিল আরও অনন্য এক ঘটনা। দুই ইনিংসেই ডাবল সেঞ্চুরি ছিল তার; ২০৪ ও ২৫১।
এর চার বছর বাদেই বড় ভাই, তখনকার বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার নাম লেখান তার পাশে। প্রতাপশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৪২ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত থাকেন ১৯৯ রানে। এর পর কেটে গেছে প্রায় একযুগ। অনেক উত্থান-পতনের পর আবারও টেস্টে ফিরেছে জিম্বাবুয়ে। আবার সেই হারারেতেই বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসেও সেঞ্চুরি করলেন টেলর। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, স্বাগতিক অধিনায়কের রুদ্রমূর্তিতেই কপাল পুড়লো তাদের। তবে, বাংলাদেশের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের অধিনায়কদের জ্বলে ওঠার ইতিহাস অনেক দিন আগের। ফ্লাওয়ার ভাই, হিথ স্ট্রিক থেকে শুরু করে নিকট অতীতের টটেন্ডো টাইবু, প্রসপার উেসয়া সবাই বেশ সফল বাংলাদেশের বিপক্ষে। সেই ধারাবাহিকতায়ই এবার একাই জিম্বাবুয়েকে দারুণ এক অবস্থানে নিয়ে গেলেন ব্রেন্ডন টেলর।
প্রথম ইনিংসেই গড়েছিলেন দারুণ এক রেকর্ড। দেশটির স্বাধীনতা দিবসে যখন ১৭১ রান করে এনামুল হক জুনিয়রের বলে সাজঘরে ফিরলেন তখন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ রানের স্কোরটা নিজের নামে করে ফেলেছিলেন তিনি। সেই ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের করা ১৫৬ রানই দীর্ঘকাল ধরে রেকর্ডবুকে টিকে ছিল। সেই ইনিংসও ছিল এই হারারেতেই।
সাত উইকেটে ১৮৭ রান নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শেষ করে জিম্বাবুয়ে। তখন সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১৯ রান দূরে টেলর। চতুর্থ দিনে নেমে ইনিংস ঘোষণার তাড়াতেই কি না খুব বেশি সময় নিলেন না; মাত্র ১৯ বল লাগলো তার তিন অঙ্কে পৌঁছাতে। চার ঘণ্টায় ১০২ রানের ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও একটি বিশাল ছয়। বাংলাদেশ দলের সামনে ৪৮৩ রানের পাহাড় দাঁড় করানোর পাশাপাশি অধিনায়কত্ব হারানোর শঙ্কাও দূর করলেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাজে পারফরম্যান্সের পরও তার উপর ভরসা রাখার জন্য নির্বাচকদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতেই পারেন তিনি!
স্কোর কার্ড (হারারে টেস্ট)
জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংস:৩৮৯ (অল আউট)
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস:১৩৪ (অল আউট)
জিম্বাবুয়ে দ্বিতীয় ইনিংস: (তৃতীয় দিন শেষে ১৮৭/৭।
টেলর অপরাজিত ১০২
মেথ অপরাজিত ৩১
মোট (সাত উইকেট ৬৪ ওভার, ডিক্লেয়ার্ড) ২২৭
বাংলাদেশ বোলিং:রবিউল:১৯-১-৭১-৬, রুবেল:১০-০-৪৪-০, সাকিব:৯-২-২২-০, এনামুল:১৩-২-৪৫-০, সোহাগ:৯-০-২৪-০, মাহমুদুল্লাহ:৪-২-১৯-০।
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস
জহুরুল এলবিডব্লিউ ব মেথ ২২
নাফীস ব জার্ভিস ১১
আশরাফুল রান আউট (টেলর) ৪০
মাহমুদুল্লাহ ক উইলিয়ামস ব জার্ভিস ২১
সাকিব ক সিবান্দা ব মাসাকাদজা ৪
মুশফিক ক টেলর ব চিগুম্বুরা ৩
নাসির ব ক্রেমার ২৩
সোহাগ স্টা মুতাম্বামি ব ক্রেমার ৪
এনামুল অপরাজিত ৬
রুবেল ক মাসাকাদজা ব ক্রেমার ৪
রবিউল ক জার্ভিস ব ক্রেমার ০
অতিরিক্ত (বাই ৮, নো বল ১) ৯
মোট (অল আউট; ৪৯.২ ওভার) ১৪৭
উইকেট পতন: ১-২১(নাফীস, ৬.৬ ওভার), ২-৪১(জহুরুল, ১৪.৫), ৩-৭৭(মাহমুদুল্লাহ, ২২.৪ ওভার), ৪-৮১(সাকিব, ২৬.২ ওভার), ৫-৮৫(মুশফিক, ২৮.৫ ওভার), ৬-১৩২(আশরাফুল, ৪০.৬ ওভার), ৭-১৩৬(নাসির, ৪৩.৫ ওভার), ৮-১৩৯(সোহাগ, ৪৫.২ ওভার), ৯-১৪৭(রুবেল, ৪৯.১ ওভার), ১০-১৪৭(রবিউল, ৪৯.২ ওভার)।
জিম্বাবুয়ে বোলিং:জার্ভিস:১৭-১-৭৫-৩, মেথ:১২-৫-১৬-০, মাসাকাদজা:১০-৪-২৬-১, চিগাম্বুরা:৫-০-১৮-১, ক্রেমার:৫.২-১-৪-৪।
ফল:জিম্বাবুয়ে ৩৩৫ রানে জয়ী
সিরিজ: দুই টেস্ট সিরিজে জিম্বাবুয়ে ১-০ তে এগিয়ে
ম্যান অব দ্য ম্যাচ:ব্রেন্ডন টেলর
