কেউ বলছেন ২০১১ সালের জিম্বাবুয়ে সফরের স্মৃতি ফিরে এসেছে, কেউ বলছেন গত বিশ্বকাপের সেই ৫৮ ও ৭৮ রানের স্মৃতি ফিরে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, সেগুলোর পেছনে তবু যুক্তি খুঁজে বের করা যায়। তাই বলা যায়, ২০০৩ বিশ্বকাপে কানাডা-কেনিয়ার বিপক্ষে সেই বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশের এমন ভয়াবহ পতন ক্রিকেট মাঠে সম্ভবত আর ঘটেনি।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরপর দু’ ইনিংসে দেড়শ’ রানের নিচে অলআউট হয়ে ৩৩৫ রানে ম্যাচ হারার এই ভয়াবহ ধাক্কায় ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সকলেই তাই ক্ষুব্ধ, হতাশ; সবচেয়ে বেশি বিস্মিত। এমনকি ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারাও বলছেন, তারা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না এই ফলাফল। একইরকম কথা বলছেন দেশের সাবেক ক্রিকেটাররাও।
অনুশীলন ম্যাচ ছিল না, প্রস্তুতির সময় খুব কম পাওয়া গেছে, জিম্বাবুয়েতে হোটেলে প্রবল সমস্যা; এসব যুক্তি অনেকেই দিচ্ছেন। কিন্তু এই পরাজয়ের কাছে সেগুলোকেও অজুহাত বলে মনে হচ্ছে। বিসিবি কর্মকর্তারা তাই এসব অজুহাত নিয়ে কোনো কথা বলতে খুব রাজি নন। তারপরও এক কর্মকর্তা ইনজুরিকে কিছুটা হলেও দায় দিচ্ছেন।
কাল হারারে টেস্ট প্রসংগে কথা বলতে গিয়ে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন সিরাজ বললেন, ‘শ্রীলংকার মত হারারে টেস্টেও আমাদের মূল বাধা হয়েছিল ইনজুরি। ওপেনিংয়ে তামিমের ইনজুরি, পরীক্ষার কারণে খেলতে পারেনি বিজয়। টেল এন্ডার হিসেবে আবুল হাসান রাজু খুব ভালো পারফরমার; কিন্তু দেখেন সেও ইনজুরিতে পড়ে আছে। তাই আমি মনে করি, প্রাকটিস ম্যাচ কিংবা প্রস্তুতির কোন ঘাটতি ছিল না এখানে। আমাদের সামনে বড় বাধা ছিল ইনজুরি’।
ইনজুরির কারণে যদি দল সাজাতেই সমস্যা হয়, তবে কেন শ্রীলংকা সফরে ভালো খেলা মোমিনুল হক নেই দলে? কিংবা শ্রীলংকা সফরে বাজে ব্যাটিংয়ের পরও কেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দলে? এসব প্রশ্ন উঠেছে হারারে টেস্ট মাত্র চারদিনে শেষ হওয়ায়। তবে এর জন্য ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যানের কাছ থেকে কেন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান ম্যাচ রেফারি রকিবুল হাসান এ প্রসংগে বলেন, ‘রিয়াদের জায়গায় মনে হয় একজন পেসার নিলে ভালো হত। তাছাড়া আমাদের খেলোয়াড়রা যেভাবে আউট হয়েছে তা আসলে মেনে নেয়া যায় না’।
অনেকদিন ধরে ভালো খেললে একটি-কিংবা দুই ইনিংসে বাজে ব্যাটিং হতেই পারে বলে অনেকের ধারণা। অনেকে এটিকে দুর্ঘটনা বলেও মন্তব্য করতে পারেন। কিন্তু ধারাভাষ্যকার রকিবুল এটিকে দুর্ঘটনা বলতে নারাজ, ‘আমার তো বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশ এমন পারফর্মেন্স করবে। এটিকে দুর্ঘটনা বলা ঠিক নয়। মনে হয়েছে সবার ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে। মুশফিক যেভাবে আউট হয়েছে; সেটা পরিষ্কার দ্বিধাদ্বন্দ্বের ফল। একবার মনে হয়েছে সে খেলবে, আবার মনে হয়েছে খেলবে না। এমন দোলাচলের কারণে সে উইকেট দিয়ে এসেছে। সাকিবের ব্যাটিং দেখে মনে হয়েছে সে টি-টোয়েন্টি কিংবা ওয়ানডে খেলতে এসেছে’।
বাংলাদেশের আউটগুলো নিয়ে সমালোচনা করতে ছাড়েনি বিসিবিও। ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান তো ক্ষোভের সাথেই জানালেন, খেলোয়াড়দের দায়িত্ববোধের অভাব রয়েছে, ‘রিয়াদ যেভাবে আউট হয়েছে এটা কি মেনে নেয়া যায়? আশরাফুল কেন বোকার মত দৌড় দিতে যাবে? তাদের উইকেট দিয়ে আসা দেখে আমাদের সত্যি খারাপ লাগছে। তারা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারেনি’।
জিম্বাবুয়ের কাছে ৩৩৫ রানের বিশাল ব্যবধানে হার। রানের দিক থেকে জিম্বাবুয়ের কাছে এটিই সবচেয়ে বড় পরাজয় মুশফিকদের। চার বছর পর যে দলটি টেস্ট স্ট্যাটাস পুনরুদ্ধার পেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করছে, তাদের কাছে এত বড় ব্যবধানে পরাজয়ের দুঃখ তো ভোলার নয়। সিরাজ জানালেন, ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের পারফর্মেন্সের তদারকি করছে। দলের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। হারারের প্রথম টেস্টের মত দ্বিতীয় টেস্টেও যেন ভরাডুবি না হয় সেদিকে নজরদারি রাখা হচ্ছে। জানা গেছে, ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় টেস্টে দলে কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে। ইনজুরি সেরে দলে ফিরতে পারেন তামিম ইকবাল। সেক্ষেত্রে বাদ পড়তে পারেন শাহরিয়ার নাফীস। আর হারারের উইকেটের বৈচিত্র্যতা দেখে একজন বাড়তি পেসার নেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে টিম ম্যানেজম্যান্টের। সেক্ষেত্রে সহ-অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের উপর খড়গটা পড়তে পারে।
