মিয়ানমার

সম্ভাবনার দোলাচলে সাম্প্রদায়িকতার আগুন

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ২০:৩০
মিয়ানমার; যেখানে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান ছাড়াই বইতে শুরু করেছে গণতন্ত্রের সুবাতাস। রাজনীতির বহিরাবনে চাঙ্গা হতে শুরু করেছে অর্থনীতিও। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে সম্পদশালী ঐ দেশ যেন এক গুপ্তধন। চীন এমনকি ভারতেরও নজর সেখানে। এরই মধ্যে মিয়ানমারে বহুজাতিক কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব কিছুর মধ্যে যেন তুষের মতো জ্বলছে সামপ্রদায়িক সহিংসতা আর হিংস্রতা; যা এতদিন কেউ সেখানে প্রত্যক্ষ করেনি। মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ‘শান’। চীন সীমান্তবর্তী এই প্রদেশের রাজধানী ‘লাশিও’। বিভিন্ন উপজাতি ও ধর্মাবলম্বীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সেখানে। এই সংস্কৃতিই শান প্রদেশের প্রধান ঐতিহ্য। কিন্তু সবশেষ গত বুধবার হঠাত্-ই অশান্ত হয়ে ওঠে লাশিও। সংখ্যালঘু মুসলমানদের খোঁজে লাঠি-সোটা আর লোহার রড নিয়ে মোটর সাইকেলে বেরিয়ে পড়ে শত শত বৌদ্ধ যুবক। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। ভয়ে বহু বৌদ্ধ ও মুসলমান নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির দরজা-জানালা আটকে ঘরে বসেছিলেন। তবে একটি মসজিদ, এতিমখানা ও একটি সিনেমা হল জ্বালিয়ে দেয়ার খবর ফলাও করে প্রচার করা হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এতে বলা হয়, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় আরাকান বা রাখাইন প্রদেশ থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশটির কেন্দ্র ভেদ করে পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। লাশিও’র সহিংসতা শুরু হয় একজন বৌদ্ধ নারীর গায়ে এক সংখ্যালঘুর আগুন লাগানোর গুজবে। তবে সহিংসতা সামাল দেবার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের তত্পরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গত বছর আরাকান রাজ্যের সিত্তে এলাকায় সহিংসতার পর সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ওঠে, লাশিওতে এসে সেগুলোই যেন আরো বদ্ধমূল হয়। সবাইকে শান্ত হবার আহ্বান জানিয়ে কার্ফিউ জারির পর লাশিও’র সহিংস পরিস্থিতি শান্ত হয়। ফেসবুকে বিবৃতি দেন প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের এক মুখপাত্র। এতে তিনি বলেন, ‘আমরা যে গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে যাচ্ছি, তাতে ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষতি করা বা সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর কাজ মানায় না এবং অপরাধমূলক যে কোন কাজের বিচার আইনানুগ হবে’। ঐ বিবৃতিতে দু’টি ধর্মীয় ভবন ও বেশ কিছু দোকানে আগুন দেয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে তা কোন ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় বা এতিমখানা, তা জানানো হয়নি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, অগ্নিদগ্ধ ঐ বৌদ্ধ নারীকে হাসপাতালে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। আর তার গায়ে আগুন দেয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একজন ভারতীয় মুসলমান; তাকে আটক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঐ ব্যক্তির পকেটে উত্তেজক মাদকও পাওয়া গেছে। মাদক রাখার দায়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। তবে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও মারধরে অন্তত একজনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো বৌদ্ধকে আটক করা হয়েছে কি-না, তা জানায়নি কেউই। তাই প্রশ্ন উঠেছে, বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সংখ্যালঘু মুসলমানরা আদৌ সুবিচার পাবে কি-না! গত মঙ্গলবার রাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ শতাধিক বিক্ষোভকারী থানায় গিয়ে আটককৃত ব্যক্তিকে তাদের হাতে হস্তান্তরের দাবি জানায়। পরে তারা শহরজুড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং লাশিও’র সবচেয়ে বড় মসজিদ, একটি এতিমখানা ও কয়েকটি দোকানে আগুন দেয়। মিয়ানমারে বৌদ্ধ ও মুসলমানদের এই দাঙ্গা মূলত চাঙ্গা হয় পশ্চিমের রাখাইন বা আরাকান রাজ্য থেকে। সেখানে মারা যায় প্রায় দুইশ’ জন। যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। বাড়ি ছাড়া হয় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। পরিস্থিতি সামলানোর কথা বলে স্থানীয় প্রশাসন উল্টো সহিসংতায় যোগ দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। নিরাপত্তা কর্মীরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালায়। রোহিঙ্গাদের গণহারে গ্রেফতার করা হয়। আহত অন্যান্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া হয় উপকূল এলাকায় সাময়িকভাবে স্থাপিত শরণার্থী শিবিরের তাঁবুতে। এই সহিংসতা পরে আশপাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এসব বিক্ষোভ-দাঙ্গায় অংশ নেন। গত মার্চে সহিংসতা গিয়ে পৌঁছায় মিয়ানমারের কেন্দ্রস্থলে মিকতিলা শহরে। ঐ সহিংসতায় সেখানে মারা যায় অন্তত ৪৩ জন। এ মাসের শুরুতে ওই সহিংসতার জন্য সাতজন মুসলমানকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় একটি আদালত। এছাড়াও আরো সাতটি শহরে প্রাণঘাতি সহিংসতা দেখা দেয়। তবে মৃতের সংখ্যা সেসব স্থানে কম। জ্বালিয়ে দেয়া হয় অনেক মসজিদ এবং মুসলমানদের দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মিয়ানমারে প্রায় ৬ কোটি জনগোষ্ঠীর মাত্র চার শতাংশ বা প্রায় ২৪ লাখ মুসলমান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রদায়িকতার বীজ ঘনিষ্ঠভাবে বিরাজ করছে ঐ দেশের বৌদ্ধ আধিপত্যবাদী জাতীয়তাবাদ চেতনার মধ্যে। এছাড়াও রাখাইনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোয় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয় বলে স্বীকৃত। অজনপ্রিয় সংখ্যালঘুদের পক্ষে তাই কোন কথা বলতে নারাজ গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অংসান সু চিসহ অন্যান্য নেতারা। সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সংখ্যালঘুদের রক্ষায় সরকারের কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এ সবে সেদেশের সরকার কান দিক আর নাই দিক, দীর্ঘদিন পশ্চাত্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মিয়ানমারের অর্থনীতিকে কেউ আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না। কয়েক যুগ পর জাপান ও মার্কিন সরকার প্রধানের নেপিত সফর অন্তত সে কথারই প্রমাণ দেয়। গার্মেন্টস পণ্যসহ বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে মিয়ানমারে বাণিজ্য সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছে। ডিলারশিপ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে গাড়ি প্রস্তুতকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্ড’। অর্ধ শতাব্দিরও বেশি সময় ধরে নিরব থাকার পর মিয়ানমারে হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই চালু হবে কোমল পানীয় কোকা-কোলার প্ল্যান্ট। ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন-গুগল এবং অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীরাও সেখানে ছুটছেন গুপ্তধন আবিষ্কারের আশায়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করে একটি বাণিজ্য চুক্তিও সেরে ফেলেন বার্মিজ প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে মিয়ানমারের কোম্পানিগুলোকে দেয়া হয়েছে জিএসপি সুবিধা। দেশটির উপর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর দ্রুতই ঘটছে সবকিছু। শুধু গত বছরই মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে তার আগের বছরের তুলনায় পাঁচগুণ। অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রতিষ্ঠান ম্যাক কিন্সলে গত শুক্রবার জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ঐ দেশের অর্থনীতি হবে বর্তমানের তুলনায় চারগুণ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে মাত্র ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতি হবে দুইশ’ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। এর চাবিকাঠি হিসেবে ঐ গবেষণায় দেখানো হয়েছে মিয়ানমারের গ্যাস ও মূল্যবান রত্নসহ প্রাকৃতিক সম্পদ ও খনি, কৃষি, পণ্য উত্পাদন এবং অবকাঠামো খাতকে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে এতদিনে ঐ অর্থনীতির অংশীদার হতে যাচ্ছে, চীনের মতো শক্তিধর দেশের দৃঢ় অবস্থান সেখানে অন্তত ৩০ বছর আগে থেকে। এছাড়াও সেখানে আছে ভারতের সতর্ক ও কৌশলী পদচারণা। এমন বাস্তবতায় চীন সীমান্তবর্তী কাচিন প্রদেশের বিদ্রোহীদের সাথে মিয়ানমার সরকারের শান্তিচুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং তাদের রক্ষার প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারলে তো আর কথাই নেই। তা না হলে হয়তো মিয়ানমারের সমৃদ্ধির নিচে তুষের মতো জ্বলতে থাকবে সাম্প্রদায়িকতার আগুন।