আমাদের পোশাক শিল্প

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০১৩, ২১:০১
৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাঙালি জাতি অর্জন করে লাল সবুজের এক পতাকা। যে পতাকা তাদেরকে শেখায় বিশ্বের দরবারে কিভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, অনুপ্রাণিত করে নতুনভাবে জীবনকে গড়ে তোলার । শুধু কি তাই? অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির পথও দেখিয়ে দেয়। শুরুর দিকে সে পথটি দুর্গম থাকলেও আশির দশকে সেলাই দিদি মনিদের যাত্রী করে পোশাক শিল্প নামক রেলগাড়িটি নির্বিঘ্নে সে পথ পাড়ি দিতে থাকে। ছুটতে থাকে স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত স্টেশনে, যেখানে গেলে পাওয়া যাবে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির মূলমন্ত্র। যেখান থেকে সবসময় বেজে উঠে বেকারত্বকে পরাজিত করার ঘণ্টাধ্বনি। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি, দ্রুতবেগে ছুটে চলা সেই রেলগাড়ির কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা আজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সেলাই দিদিদের ন্যায্য মজুরি প্রদান না করা, আগুনে পুড়ে ও ভবন ধসে তাদের নির্মম মৃত্যু, তাদের উপর মালিকদের পৈশাচিক মনোভাবই মূলত এর জন্য দায়ী। একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাবো ১৯৯০-২০১৩ সাল পর্যন্ত পোশাক শিল্পের অভিভাবক বিজেএমইএ-এর হিসাব মতে, প্রায় ১,৫১৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছে আগুনে পুড়ে ও ধসে যাওয়া ভবনের ইট, কংক্রিটের নিচে। এ নির্মমতার শেষটি দেখা গেছে সাভারের রানা প্লাজায়। যেখানে প্রায় ১,১২৯ সহকর্মীদের চিরতরে হারান সেলাই দিদিমনিরা, আহত হয় প্রায় কয়েক হাজার কর্মী। নতুন প্রজন্ম প্রথমবারের মত প্রত্যক্ষ করে একটি বিশাল মৃত্যুর মিছিল। শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে গোটা জাতি। এখানেই শেষ নয়, এই ঘটনা বিশ্ব মিডিয়াকেও নাড়া দেয়। আলজাজিরা, সিএনএন, এনডিটিভির মত চ্যানেলগুলো খুব গুরুত্বের সাথে প্রচার করে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে। আন্তর্জাতিকমহলের দৃষ্টিপাত হয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার নায়িকা সেলাই দিদিমনিদের নির্মম শবযাত্রার উপর। প্রশ্ন এবং সমালোচনার ঝড় ওঠে সমগ্র বিশ্বে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগুরু পোপ বারগোগর্লিও এর তীব্র নিন্দা জানান। আর সেই সাথে বিশ্বের চোখে ধরা পড়ে এক অপ্রদর্শিত চিত্র। যে চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানায় কাজের সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশের অভাব, শ্রমিকদের স্বল্প মজুরি প্রদান, দুর্বল ট্রেড ইউনিয়ন, মুনাফালোভী মালিকদের আধিপত্য প্রভৃতি। যে দেশ শান্তিতে নোবেল পেয়েছে, হিমালয়ের চূড়ায় তার পতাকা উড়িয়েছে, ক্রিকেট পরাশক্তিদের হারিয়ে ক্রিকেট পাগল জাতি হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে, জাতিসংঘে শিশু মৃত্যু হ্রাসের জন্য এমডিজি পুরস্কার লাভ করেছে, সে দেশের জন্য এই ঘটনাগুলো কোন সভ্য জাতিই কামনা করতে পারে না। এ অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা। এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন দরকার। বাংলাদেশকে সেলাই দিদিরা অনেক দিয়েছে, এবার তাদেরকে দেয়ার পালা। এ জন্য আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা, মুনাফালোভী মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তন, শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগ, ন্যায্য মজুরি প্রদান। বাংলাদেশে শ্রমিকদের যে মজুরি প্রদান করা হয় তা খুবই স্বল্প। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বিশ্বের যে ২৬টি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের বেতন কাঠামো দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ঘণ্টায় ৮.২৫-১৪.০০ $ দিয়ে থাকে আর বাংলাদেশ সেখানে ০.২১ $ প্রদান করে থাকে। অথচ মুনাফা লাভের ক্ষেত্রে মালিকদের অবস্থান শীর্ষে। সেলাই দিদিমনিদের উপর আর অবিচার নয়। কারণ সেলাই দিদিমনিরা কখনোই চায় না বিদেশিরা মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা পোশাক পরিধান থেকে বঞ্চিত হোক, বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ুক বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দৌড়ে, বাতিল হয়ে যাক জিএসপি সুবিধা। তারা শুধু চায় জীবনের নিরাপত্তা, দু’বেলা দু’মুঠো খাবার, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সুযোগ, কায়কোবাদের মত সাহসী সৈনিকের মৃত্যু তাদেরকে পীড়া দেয়, আবুল খায়েরের মত নিষ্ঠাবান সাহসী দমকল কর্মীর কান্না তাদেরকেও ব্যথিত করে। মুন্নী সাহার মত ইস্পাতসম হূদয়ের অধিকারী মানবীর কান্নাভেজা চোখ, নির্বাক চেহারা তারা আর দেখতে চায় না। সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়াতে পারার হতাশা নিয়ে মৃত্যুদূতের কাছে শাহীনার অসহায় আত্মসমর্পণের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আর নয়। শাহীনাদের সন্তানকে আর যেন মিথ্যে আশ্বাস না দিতে হয়, কারণ এভাবে মিথ্যে আশ্বাস দিতে থাকলে সেলাই দিদিমনিদের বহন করা পোশাক শিল্প নামক রেলগাড়ির স্বপ্নের স্টেশনে পৌঁছার সত্যিকারের গল্পটি হয়তো একদিন হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।  লেখক :ইংরেজি বিভাগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন