রাষ্ট্র কি সমাজ, রাজনৈতিক দল কি পরিবার চালাইতে যে দক্ষ ব্যবস্থাপকের বিকল্প নাই তাহা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করিয়া লইবেন। একটি ডুবন্তপ্রায় নৌকাকে বিপদ হইতে রক্ষা করিয়া কিভাবে তীরে পৌঁছাইয়া দিতে হয় তাহা একজন দক্ষ নাবিক ভালো করিয়া জানেন। এক্ষেত্রে একজন দক্ষ নাবিক হইয়া ওঠেন একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক। আবার নাবিকের অদক্ষতার কারণেও নিরাপদে থাকা একটি নৌকা ডুবিয়া যাইতে পারে।
বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং অফিস-আদালত চালাইতে গিয়া ব্যবস্থাপকরা গলদঘর্ম হইয়া ওঠেন। যেই দেশে রাজনৈতিক দল, অফিস আদালতসহ সর্বোপরি সমাজব্যবস্থার অভ্যন্তরভাগ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দোল খায় সেইখানে ব্যবস্থাপকদের ভূমিকা বাড়িয়া যায়। কোন কাজে সফলকাম হইতে না পারিলে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপকরা অন্যের মাথায় দোষ চাপাইয়া দেন। নানা ধরনের কারণ খুঁজিয়া বেড়ান। কিন্তু তাহারা সফলকাম হইবার জন্য কাজ শুরু করিবার আগে বিষয়গুলো মাথার মধ্যে নাড়িয়া-চাড়িয়া লইতে পারেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকরা অধীনস্তদের মাথার ওপর দোষ চাপাইয়া দিয়া পার পাইতে চেষ্টা করেন।
মনে রাখিতে হইবে, একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক ছাড়া রাষ্ট্র, সমাজ এমনকি একটি পরিবারও মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে না। একটি পরিবার যখন ভাঙিয়া যায় তখন মনে করিতে হইবে সে পরিবারের মধ্যে ভালো একজন ব্যবস্থাপক নাই। একটি প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হইয়া গেলে ওই প্রতিষ্ঠানে ভালো ব্যবস্থাপনা নাই বলিয়া মনে করিতে হইবে। এই কথাগুলি একটি রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্রের বেলায়ও সত্য। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল কিংবা অফিস-আদালতে ব্যবস্থাপকরা সফলকাম না হইলে অধীনস্থদের উপর দোষ চাপাইয়া দেন। ইহা অনেক আগে হইতে চলিয়া আসিলেও সফল না হইবার আসল কারণ কেহই অনুসন্ধান করিয়া দেখে না। নিয়ম-কানুন, আইন কিংবা সংবিধান অনুসরণ করিয়া রাষ্ট্র বা অফিস-আদালত চালাইলে ব্যবস্থাপকদিগকে কাহারো উপর দোষ চাপাইতে হইতো না। একজন ব্যবস্থাপক যদি আইন-কানুনের মধ্যে থাকিয়া প্রতিষ্ঠান চালাইতে চান তাহা হইলে তাহাকে টলাইবার শক্তিও দুইবার চিন্তা করিবে। যে কোন নেতিবাচক খবরে ব্যবস্থাপকদের বিচলিত হইলে চলিবে না।
আমাদের সম্পদ সীমিত এই কথা সবাই মানি। এই সীমিত সম্পদ দিয়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকান্ড চালাইয়া নেওয়া দুষ্কর তাহাও মানিতে হইবে। কিন্তু আমাদের সম্মুখে বেশকিছু দেশের উদাহরণ রহিয়া গিয়াছে। খুব বেশিদূর যাইতে হইবে না, পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের দিকে তাকাইলেই আমাদের চোখ খুলিয়া যাইবে। সীমিত সম্পদ দিয়া সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কিরূপ উন্নতি করিয়াছে তাহা সকলেরই জানা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম উহার শিল্পে বিকাশ ঘটাইয়া কোন কোন ক্ষেত্রে জাপানের সহিত পাল্লা দিবার চেষ্টা করিতেছে। আমাদের বাংলাদেশও কম যাইবার নহে। নানান ক্ষেত্রে এই দেশটির উন্নতি বিদেশিদের মাধ্যমে আমাদের কানে আসিতেছে। কিন্তু বলিবার কথা এই যে, নানান ক্ষেত্রে দক্ষ ব্যবস্থাপকের অভাবে আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। শুধু অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রেই নহে, নানা সামাজিক সমস্যা মিটাইবার ক্ষেত্রেও অনেক সময় আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছি। যাহার ফলে আমাদের অস্থিরতা বাড়িয়াই চলিয়াছে। আখেরে যাহা কোন কোন সময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও কুঠারাঘাত করিয়াছে।
সুতরাং রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সমাজ কিংবা পরিবারের অস্থিরতা নির্মূল করিতে হইলে প্রধানতম ব্যক্তির দক্ষ ব্যবস্থাপক হইবার বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে কোন দোষারোপ নয়, নেতৃত্বের মধ্যে নানা গুণাবলী সন্নিবেশিত করিয়াই সফলকাম হইবার পথ খুঁজিতে হইবে।
