কোটা প্রসঙ্গ :সমাধান কোন পথে

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২১:৫৭
বিগত বিসিএসগুলোর প্রিলিমিনারি ফলাফলের তুলনায় এবারের ফলাফলে যে নতুন সংযোজন তার ব্যাখ্যা মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও কোটা প্রথাই দেশের উন্নয়নের জন্য বিরাট এক বাধা যদিও দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার নামে সরকারি চাকরিতে কোটা চালু করা হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা পূরণের নিয়মানুযায়ী এক কোটার প্রার্থী দিয়ে অন্য কোটা পূরণ করার বিধান না থাকায় ভাইভার সময় যোগ্য প্রার্থীর অভাবে প্রায়ই কোটা পূরণ হয় না— কারণ কোটা প্রার্থীরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রিলিতেই বাদ পড়ে যায়। যেহেতু কোটায় প্রায় ৫৫% আর মেধায় প্রায় ৪৫% প্রার্থীকে চাকরি দেওয়া হয় তাই এবার প্রিলি থেকেই ৫৫% কোটা রাখা হয়েছে এবং রিটেনেও হয়তো এরকম পরিকল্পনা ছিল যাতে ভাইভা পর্যন্ত কোটা প্রার্থীরা পৌঁছতে পারে আর তাদের দিয়েই কোটা পূরণ করা যায়। অর্থাত্ মেধাবীদের কম্পিটিশন মেধাবীদের সঙ্গে আর কোটা প্রার্থীদের কম্পিটিশন কোটা প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে প্যারালালি হবে হয়তো এটাই ছিল পরিকল্পনা। এতে সমস্যার কিছু নেই যেহেতু দেশের আইনেই কোটা চালু আছে আর কোটা প্রার্থী দিয়েই কোটা পূরণের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের কোটা-আইন অনুযায়ী এবারের ফলাফলের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের আন্দোলন অযৌক্তিক বটে তবে তার চেয়েও অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি এবং চরম অযৌক্তিক মেধাবীদের তুলনায় কোটার আসন শতকরা বেশি রাখা। দেশে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিতে মুক্তিযোদ্ধা, নারী, উপজাতি, প্রতিবন্ধী, পোষ্য, জেলা, বিভাগ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার কোটা আছে। পরীক্ষার ফলাফলসহ কোটা বাতিল বা সংস্কারের দাবিতে বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে তার বিরোধীতা করতে গিয়ে বিশেষ এক শ্রেণির মানুষ নারী ও মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুকে সামনে এনে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে অপব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ‘পরীক্ষার্থীরা নম্বর জানলো কী করে?’ এমন প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ এটাকে বিশেষ মহলের কারসাজি কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যেভাবেই হোক সবকিছু ছাপিয়ে আন্দোলনের মোড় এখন কোটা বাতিল বা সংস্কারের দিকে। আন্দোলন যখন শুরু হয়েছে কিছু একটা করতেই হবে। এদেশে অনেক পরিবার আছে যেখানে অতি কষ্টে একটা সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করা হয় অথচ শুধুমাত্র কোটার কারণে তার চেয়ে কম মেধাবীরা সরকারি চাকরিতে সুযোগ পায়। কোটায় প্রার্থী না থাকলেও মেধাবীদের সুযোগ না দিয়ে আসন ফাঁকা রাখা হয়! তাহলে কোটার কোনো ক্যাটাগরিতে না পড়া কি ঐ সমস্ত মেধাবীর অপরাধ? মেধাবীরা কি তার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন একজনকে স্যার স্যার করার জন্য দেশে থাকবে? দেশে যখন তার মেধাকে মূল্যায়ন করা হয় না তখন হয় সে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যায় নয়তো বিদেশে পাড়ি জমায়। এভাবে দেশের মেধা বিদেশে যাওয়ায় একদিকে দেশ মেধাশূন্যর দিকে যাচ্ছে অন্যদিকে দেশের মেধায় বিদেশের উন্নতি হচ্ছে আর সেইসব দেশই আবার এদেশের ওপর খবরদারি করছে। আর কোটার ভারে ভারাক্রান্ত আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে পূর্বপাকিস্তানের মতোই সেই তিমিরে! পাকিস্তানি স্বৈরাচার শাসকের দমন-শোষণ-নিপীড়ন থেকে বর্তমান বাংলাদেশকে মুক্ত করে দেশ ও দেশের মানুষকে যোগ্য নেতার হাতে তুলে দিয়ে দেশকে উন্নয়নমুখী করতেই আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা যুদ্ধ করেছিল। আর স্বাধীনতার পর এসে আমরা যোগ্য-মেধাবী নেতা বা ব্যক্তির যোগ্যতা প্রমাণের পথকে রুদ্ধ করে কোটা প্রথার নামে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যক্তিদের হাতে দেশকে তুলে দিয়ে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের চিন্তা-চেতনার বিপরীতে কাজ করছি। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এসে মুক্তিযোদ্ধা/মুক্তিযোদ্ধার সন্তান খোঁজা হয়! সন্তানদের পর এখন এসেছে নাতি-নাতনি কোটা! আর কয়দিন পরে হয়তো বউ-জামাই কোটা খুলে নাতি-নাতনি কোটা জায়েজ করতে হবে। নয়তো একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের সঙ্গে যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির কোনো ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয় এবং তাদের যে সন্তান হবে সে কার নাতি-নাতনি হবে? মুক্তিযোদ্ধার নাকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির? গত ৩২তম স্পেশাল বিসিএস পরীক্ষায় যে অমুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হলো না এবং এই এক বছরে যাদের আবেদন করার বয়স শেষ হয়ে গেলো তাদের দায়ভার কে নেবে? আমার প্রশ্ন হচ্ছে ১৯৭১ সালের পরে এ দেশের অমুক্তিযোদ্ধার ঘরে জন্মগ্রহণকারী ছেলেমেয়েদের কী অপরাধ? তারা কি দেশের নাগরিক নয় যে মেধাবী হয়ে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আবেদন করতে পারবে না? কোটা পদ্ধতিতে দেশের অবহেলিত নারীসমাজকে, সুবিধাবঞ্চিত উপজাতি, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সাধারণ নাগরিক, দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিবন্ধী এবং বিশেষ করে দেশমাতৃকা রক্ষায় যারা যুদ্ধ করেছে তাদের ও তাদের সন্তানদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সুবিধা দেওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু কোটা নামের বর্তমান পদ্ধতিতে তাদের সমগোত্রীয়দের উন্নতির প্রয়াস চালানো অবাস্তবই বটে। মেধার দৌড়ে যে পিছিয়ে, কোটার সুযোগে হয়তো তার উন্নতি হতে পারে কিন্তু তার সমগোত্রের কি প্রকৃত উন্নয়ন হবে? বরং ঐ পদে কোনো মেধাবীকে সুযোগ দিলে যে কারণে প্রচলিত কোটা করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি সুবিধা হতো। জেলা কোটা হিসেবে মাগুরার একজনের চাকরি হলে যখন তার অন্য জেলায় পোস্টিং হয় তখন সে নিজ জেলার উন্নয়নে কতটুকই বা সুযোগ পায়। একইভাবে কোনো মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, কোনো উপজাতি, কোনো নারী বা কোনো প্রতিবন্ধী অল্প মেধা নিয়ে কোটার কল্যাণে চাকরি পেলে তাতে হয়তো তাদের নিজেদের পরিবারে একটু সচ্ছলতা আসবে কিন্তু যে সব মুক্তিযোদ্ধার এরকম কোনো সন্তান নেই অথবা আরো যে সব প্রতিবন্ধী আছে, আরো যে সব উপজাতি আছে, নারী আছে তাদের উন্নয়নের জন্য কোটায় আসা ঐ সব স্বল্প মেধাবীরা কি উপযুক্ত? এভাবে কি দেশের উন্নতি হবে? কোটা পদ্ধতি রাখা উচিত চাকরিতে প্রবেশের পরে আগে নয়। যেমন বিশেষ কয়েকজন মেধাবীকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে মুক্তিযোদ্ধাদের উন্নয়নের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। এদের কাজই হবে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে— প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা, তাদের কোথায় কী প্রয়োজন, কীভাবে তাদের উন্নয়ন করা যায় ইত্যাদি নিয়ে। একইভাবে মেধাবীদের দিয়ে প্রতিবন্ধী, উপজাতি, মহিলা ইত্যাদি কোটা পূরণ করিয়ে তাদেরকে দিয়েই পিছিয়ে পড়া ঐ সমস্ত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য কাজ করালে যথাযথ হবে। এখানে শুধু মেধাবীদেরই স্থান ও দিকনির্দেশনা থাকবে। এতে যে কারণে চাকরিপূর্ব কোটা আছে তার চেয়েও চাকরিপরবর্তী এ বিশেষ কোটা অধিক কার্যকরী হবে, দেশও উন্নতির দিকে ধাবিত হবে। নারায়ণগঞ্জ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন