মুক্তিযুদ্ধে ভাওয়ালিয়া বাজু’র ৪৮ ঘন্টা সম্মুখযুদ্ধ

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:১৬
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ভাওয়ালিয়া বাজুতে একাত্তুরের ২৫জুন টানা ৪৮ ঘন্টার বিশাল যুদ্ধ হয়। মহান যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ১শত ৯৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৪জন মুক্তিযুদ্ধাসহ বহু নর-নারী আহত হয়। শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান। স্বাধীনতার ৪২ বছরের আজো এ স্থানটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ কিংবা কোন স্মৃতিচিহ্ন তৈরি করা হয়নি। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এখনো সেই যুদ্ধের কথা মনে হলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ১১নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর আফসার উদ্দিন আহাম্মদ ভালুকার ভাওয়ালিয়া বাজু সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তিনি মাত্র ১টি রাইফেল নিয়ে প্রথমে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একে একে গড়ে তোলেন সাড়ে ৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে একটি ব্যাটেলিয়ান। এ ব্যাটেলিয়ানে ২৯টি কোম্পানি ছিল। তাঁর নেতৃত্বে ১৫০টি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এর মধ্যে ভাওয়ালিয়া বাজু’র একাত্তুরের ২৫ জুন ৪৮ ঘন্টার যুদ্ধটি ছিল ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। এখানে পাক বাহিনীও মুক্তিযোদ্ধারা দিনে-রাতে একটানা ৪৮ ঘন্টা যুদ্ধ করে। এ যুদ্ধে কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের দলিল ৯ম খন্ডে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী যুদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার গাজী চাঁন মিয়া, গাজী খলিলুর রহমান, গাজী আব্দুল হাই, গাজী মজিবুর রহমান, গাজী আশরাফ মুক্তিযোদ্ধাগণ জানান ঐদিনের যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা। প্রথম দফায় ৩০/৩৫ জন পাঞ্জাবী নিহত ও বহু আহত হয়। এখানে চলে দফায় দফায় একটানা ৪৮ ঘন্টার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ১শত ৯৫ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৪জন মুক্তিযুদ্ধাসহ বহু নর-নারী আহত হয়। শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান। শক্রুপক্ষ এ যুদ্ধের খবর পেয়ে ভালুকার ধীতপুর থেকে হেলিকপ্টার যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলা চালায় এবং বৃষ্টিরমতো গুলি ছুঁড়তে থাকে। চারিদিক থেকে গুলি ও প্রচন্ড ধোঁয়ায় যখন মুক্তিযোদ্ধারা কিছুই দেখতে পারছিলেন না, তখন মেজর আফসারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ ত্যাগ করে বাঁচার জন্য যে যার মতো আশ্রয় নেয়। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কান্না আজো থামেনি। এলাকাবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানালেন, স্মৃতিবিজড়িত সেই ভয়াবহ দিনের চিত্রের কথা। পাক বাহিনীর নানা অত্যাচার, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে পিতাহারা স্কুল শিক্ষিকা অপরাজিতা নন্দী বলেন, একাত্তুরের যুদ্ধে আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। আমার বাবা নিখিল নন্দী মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করায় স্বাধীনতা বিরোধীরা তাঁকে হত্যা করে। এ ঘটনা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন ও এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও ৭১’রের স্মৃতিবিজড়িত ভাওয়ালিয়া বাজু’র যুদ্ধের এ স্থানে কোন স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়নি। আগামী প্রজন্মের নিকট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে দ্রুত ভাওয়ালিয়া বাজুতে স্মৃতিসৌধ তৈরির দাবি করছি। এ দাবি এখন সকলের।