সরকার দলীয় একজন তরুণ সংসদ সদস্য ও তাহার সহযোগীদের হাতে নিগ্রহের শিকার হইয়াছেন ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক। গত রবিবার এই খবর ছাপা হইয়াছে প্রায় সবগুলি জাতীয় দৈনিকে। এই ঘটনায় ঢাকার শাহবাগ থানায় পরস্পরবিরোধী দুইটি মামলা হইয়াছে। লাঞ্ছিত সাংবাদিকদের অভিযোগ; অনুসন্ধানী রিপোর্ট করিতে গিয়া তাহারা ঐ সাংসদের ক্রোধের শিকার হন। সাংসদ নিজে তাহাদের মারধর করেন। পক্ষান্তরে এই তরুণ সাংসদ অভিযোগ করেন যে, ঐ সাংবাদিকরা তাহার নিকট চাঁদা দাবি করিয়া আসিতেছিলেন। ঘটনা পরম্পরা যাহাই হউক না কেন, মাননীয় সংসদ সদস্যের কুপিত হইবার পশ্চাতে কি কি কারণ নিহিত রহিয়াছে বা থাকিতে পারে, তাহা এইখানে আলোচ্য নহে। কেহ কাহারও নিকট চাঁদা দাবি করিলে কিংবা অন্য কোনো প্রকারে ক্ষতিসাধন করিলে তাহার আইনি প্রতিবিধানের সকল পথই খোলা রহিয়াছে। কিন্তু আইনের পথে না গিয়া সাংসদ নিজের হাতেই আইন তুলিয়া লইলেন। আপন হস্তে আইন তুলিয়া নেওয়া আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল নিঃসন্দেহে। অথচ তিনি নিজেই একজন আইন প্রণেতা।
যে সময় ও সমাজে সভ্যতা-ভব্যতা বিসর্জন দিয়া স্বয়ং কোনো আইন প্রণেতা এইরূপ আচরণ করিতে পারেন, সেই সমাজে সার্বিক পরিস্থিতি কতখানি অসহনীয় হইয়া উঠিতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। রাজধানী শহরে সাংবাদিকদের উপর যিনি ঝাঁপাইয়া পড়িতে পারেন, তিনি তাহার নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে মার্জিত ব্যবহার করেন, এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন। এই একজন মাত্র আইন প্রণেতা বলিয়া কথা নহে, অসহিষ্ণুতা, আইন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা, ঔদ্ধত্য ও অনাচার সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়াইয়া পড়িয়াছে কর্কটব্যাধির ন্যায়। শাসক দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী-ক্যাডার হইতে শুরু করিয়া উঁচু পর্যায়ের একশ্রেণীর নেতা-কর্মীর ঔদ্ধত্য সকল সীমা ছাড়াইয়া গিয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না। ইহারা ধরাকে যেনবা সরা জ্ঞান করিতে শুরু করিয়াছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি, গুন্ডামি-মাস্তানি-তাফালিং— কী না করিয়া চলিয়াছে ইহারা। এদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ তিক্ত-বিরক্ত, বহু ক্ষেত্রে ভীত-সন্ত্রস্ত। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারিগণ ইহাদের পেশিশক্তির কাছে যেন অসহায়।
পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হয়, দেশে আইন-কানুন ও শৃঙ্খলা বলিয়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে যেন বা প্রতিকারের সকল পথ। শহর ও গ্রামে; দেশের নানা প্রান্তে একের পর এক ঘটিয়া চলিয়াছে অন্যায়-অনাচার। কোথাও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না বলিয়াই ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে অনাচারীদের আস্ফাালন। এই শ্রেণীর নেতা-কর্মী এবং সরকার দলীয় কোনো কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির অন্যায় অপকর্মের দায়ভার শেষপর্যন্ত কিন্তু সরকারের প্রধান নির্বাহীর স্কন্ধেই গিয়া বর্তায়। ভাবমূর্তি নষ্ট হয় শীর্ষ নেতৃত্বের। কাজেই ক্ষমতার আঁঁচে যাহারা বেপরোয়া, তাহাদের সামাল দিতে না পারিলে আখেরে মূল্য দিতে হইবে নিশ্চয়ই। তরুণ সংসদ সদস্য যে কাণ্ড ঘটাইয়াছেন তাহা অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়।
