আমাদের জীবন, আমাদের প্রবণতা

আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৩, ২১:৩৬
আনন্দ কিংবা সৌন্দর্য—দু’টোর কোনোটাই আমরা আমাদের জীবনে উদ্যাপন করতে পারছি না তেমন। এ না পারার ব্যর্থতা অনেক। অথচ দায়-দায়িত্ব পালনে আমরা সচেষ্ট নই। বাস্তবে খুব একটা না হলেও নেতা-নেত্রীদের মুখে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে চলেছে দিনের পর দিন। প্রকৃতপক্ষে সরকার যায়, সরকার আসে, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না; জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন হয় না। গরিব আরো গরিব হয়, ধনী আরো ধনী হয়, বণ্টন বৈষম্য বাড়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে শোষণ-বঞ্চনা। কারো ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কিংবা জবাবদিহিতার বালাই নেই। একের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে আমাদের জুড়ি নেই। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটা এমন- জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার পথ সুগম নয়। জবাবদিহিতা না থাকলেও আমাদের দেশে ধাক্কাধাক্কি, জোরজবরদস্তি ও তোয়াজ-তোষামোদ বেশ আছে। এখন আর িনর্দ্বন্দ্বে, নিশ্চিন্তে কোনো কিছুকে বিশ্বাস করে নেয়ার উপায় নেই। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবকিছু সম্পর্কে সন্দিহান হতে হবে। রাজনীতির নামে এদেশে একটি ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে। রাজনীতিবিদগণ তো ননই, দেশের সাধারণ মানুষও ভাবতে চান না যে, রাজনীতির মান উন্নত না করে আমাদের উন্নতির উপায় নেই। রাজনীতির নামে এদেশে চলে সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বানানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। আর বাইরের আধিপত্যবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণের পরিণাম যে ভয়াবহ, তাতো আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। জাতীয় ঐক্য ও সংহতির বদলে নানাভাবে জাতিকে বিভাজন ও জাতিসত্তাকে খণ্ডিত করে চলেছি। একটি বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাহত করে চলেছে, ধর্ম নয়—ধর্মীয় গোঁড়ামি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। জাতির প্রাণশক্তিকে শেষ করে দেয়ার জন্য দেশ ও জাতির শত্রু বিশেষ একটি মহল ধনুর্ভঙ পণ করেছে। তাদের নানা ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জাতি অতিষ্ঠ, সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ ও দুর্যোগে নিপতিত। দেশ ও জাতির শত্রু এই বিশেষ মহলটিকে রুখে দাঁড়াতে সরকারকে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে সরকারকে আরো আন্তরিক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারসহ সকলের। দেশের সচেতন নাগরিকসহ এ ব্যাপারে সরকারকে ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সন্ত্রাসী আক্রমণ, কার্যকলাপ যে মহল বা যেই করুক না কেন, তারা দেশ ও জাতির শত্রু ও অমঙ্গলের নানা আয়োজন নিয়ে ওত পেতে থাকে। তাদের সঙ্গে রয়েছে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য দেশি এবং বিদেশি নানা শক্তি। আমাদের দেশের বিশেষ একটি মহল বাইরের ধ্বংসাত্মক শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। ঘরে-বাইরের এই অপশক্তিকে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মানুষ সত্যিকার অভাব-অনটন থেকে তখনই বাঁচতে পারে, যখন মানুষের অধিকারসমূহ ভোগ করার জন্যে সকল মানুষের স্বাভাবিক অবিচ্ছেদ্য সমঅধিকারের স্বীকৃতি থাকে। এজন্যে মানবাধিকার ও মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মানুসের প্রয়োজনেই নিজের আপনগন্ডির নিরাপদ বৃত্ত নিশ্চিত করলেই হবে না, অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এগিয়ে আসতে হবে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, দেশের অধিকাংশ মানুষেরই বিচার-বিবেচনাকেই নেই, ন্যায়-অন্যায়বোধ নেই। থাকলেও ন্যায়-অন্যায়বোধের কার্যকরি প্রতিফলন নেই। নেই কর্তব্য-অকর্তব্য জ্ঞান; কিংবা থাকলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। আমরা সব সময়ই পরর্চ্চা করে চলেছি। অন্যের দুর্বলতা নিয়ে পরিহাস করতে আমাদের আনন্দ। মানুষের প্রতি নির্দয় ও নিষ্ঠুর আচরণ করে আমরা এক একজন ‘বাহাদুর’ বনে যাই। অথচ একবারও ভেবে দেখছি না দেশের কথা, দেশের মানুষের কথা। আধিপত্যবাদীরা আমাদের গিলে খাচ্ছে। জাতির কৃতি সন্তানদের অনেকেই অদূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দিচ্ছেন বারবার। অবিমূল্যকারী কার্যকলাপ অনেকেরই স্বভাবে পরিণত হয়েছে। এমন জীবন চাই—যে জীবন কেবল আলো নয়, সাক্ষাত্ আগুন। যে আগুনে থাকে দাহ এবং আলো। যে আগুন আমাদের পোড়াবে না, রক্ষা করবে। যে আগুন আমাদের আলোকিত ও সুন্দর জীবনযাপন করতে শেখাবে। লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন