গত জুনে তুরস্কে সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলেছিলো। গেজি পার্কের ৬০০ গাছ কেটে একটি বিপণিকেন্দ্র নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে বিক্ষোভকারী হঠাতে তুরস্ক বল প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছিলো। বিক্ষোভকারীদের উপর চড়াও হওয়ায় তিক্ত সমালোচনার মুখে বলপ্রয়োগের নীতি থেকে সরে যায় এরদোয়ানের সরকার। রাশিয়ায় বিরোধী দলীয় নেতাকে কারাদণ্ড দেয়ার পর তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়ে ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার। কিন্তু তিনি বল প্রয়োগ করেননি। এটাই হলো গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের বড় পার্থক্য। রাশিয়া ও তুরস্ক জনমতকে গুরুত্ব দিয়েছে। মিসরের সেনা শাসকদের মতো আচরণ করেনি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিসরে সেনা শাসকদের নির্দেশে একশোর বেশি নিরীহ মানুষের প্রাণ গেছে। এ ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলো বলা যায়, নমনীয় ভাষায় মিসরের জেনারেলদের সমালোচনা করেছে। তারা উভয় পক্ষকে সহিংসতা থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছে। পশ্চিমাদের এই নম্র বিশ্বাস ঘাতকতায় শুধু যে সাহসের অভাব রয়েছে তা নয় বরং মিসর নিয়ে পশ্চিমা শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর যে স্বার্থ নিহিত রয়েছে তাও স্পষ্ট হয়েছে।
মিসরে ব্রাদারহুড দলের অর্থাত্ ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির পক্ষে বিক্ষোভকারীরা যে জায়গায় বিক্ষোভ করছেন সেটা মিসরের আধুনিক ইতিহাসের অংশ। তিন দশক আগে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত আততায়ীর হাতে এ জায়গায় নিহত হয়েছিলেন। মুরসির সমার্থকদের দাবি তাকে আবারো ক্ষমতায় বসাতে হবে।
গত সপ্তাহে দাঙ্গা পুলিশ তাদের উপর গুলি চালালে ঘটনাস্থলে ৮০ জনের বেশি প্রাণ হারায়। এ ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উপদেশ দিয়েছেন। তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি সহিংস পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসার আহবান জানিয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই ধরনের আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু তারা কোনো চাপ প্রয়োগ করছেন না। মার্কিন প্রশাসন বলছে না মিসরে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। সামরিক সরকার এখন দেশ চালাচ্ছে। কারণ এটা বললে মিসর তো আর্থিক সহযোগিতা পাবে না। আসলে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে যখন ধর্ম নিরপেক্ষাতার নামে আন্দোলন হয় তখন পশ্চিমারা এক ধরনের অবস্থান গ্রহণ করে। বলা চলে সেই ধর্ম নিরপেক্ষ উদারপন্থীদের পক্ষে জোরালো অবস্থান থাকে তাদের। কিন্তু যখন মুসলিমরা আন্দোলন করে, ন্যায়ের জন্য লড়াই করে তখন তাদের বিপরীতমুখী অবস্থান সহজেই লক্ষণীয় হয়।
পশ্চিমারা সারা বিশ্বে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করে। কিন্তু সব দেশেই গণতন্ত্র থাকবে এটা তো শাশ্বত কোনো বিধি বা বিধান নয়। বরং এ ধারণার মধ্য দিয়ে তারা সেক্যুলারিস্টদের ক্ষমতায় বসানোর কৌশল খোঁজে। মিসরের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের এ চেহারা বেরিয়ে এসেছে। এখন পশ্চিমা দেশগুলো ব্রাদারহুডকে মিসরের রাজনীতি থেকে বাইরে রাখার রাস্তা খুঁজছে। যদিও সে রাস্তা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
মিসরের সেনাবাহিনীতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব তীব্র। এ অবস্থায় ব্রাদারহুড ফের ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেলে তারা কি আসতে দেবে। এ বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। ক্ষমতাসীন সেনাবাহিনী জানে তারা এখন যা চাইবে তাই করতে পারবে। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো সে সুযোগ ও সাহস তাদের দিয়েছে। বর্তমান সেনা প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি বলেন, গত ২৬ জুলাইয়ের বিক্ষোভ আমাকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার বৈধতা দিয়েছে। বিক্ষোভ দমনে ইতিমধ্যে এই সামরিক শাসক এমন সব কাজ করতে শুরু করেছে যা স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের সময় প্রচলিত ছিলো। ফলে যেসব উদারপন্থী মুরসিকে হটানোর জন্য আন্দোলন করেছিলো তাদের স্বপ্ন দ্রুতই ভেঙে যাবে। মুরসিকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য এক সময় তাদের অনুতাপও করতে হবে।
নিশ্চিতভাবেই ব্রাদারহুড দেশ ভালোভাবে চালাতে পারেনি। তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার চিন্তা করেছে। দেশের অর্থনীতির কথা ভাবেনি। তারা বিশৃঙ্খল ও দলীয় মনোভাব নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছে। কিন্তু ইসলামপন্থীরাই মিসরে সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজনীতি ও ক্ষমতা থেকে তাদের দূরে রাখার একটি উপায় হচ্ছে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি। আর এটা যদি হয়, মিসর কখনোই একটি স্বাধীন দেশ হয়ে অগ্রসর হতে পারবে না।
পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর গণতন্ত্র বিস্তারের স্বার্থ রয়েছে। এটা শুধু মিসরে নয়। রাজনীতিবিদরা অনেকেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোকে পরামর্শ দিতে পারে সামরিক নেতাদের ক্ষমতায় রাখার জন্য। প্রথমে তারা সেনা অভ্যুত্থানকে সমালোচনা করে আবার নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে। পরে হয়তো বলবে বেসামরিক মানুষদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্য। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে তারা কপটতা করছে। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না।
