আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলি লইয়া আমাদের অভিযোগের অন্ত নাই। পুলিশ কিংবা র্যাবের হেফাজতে আসামী খুন হইয়াছে, তাহারা ঘুষ খাইয়াছে, অকারণে আটক করিয়াছে, হয়রানির একশেষ করিয়াছে; তাহারা মূলত প্রতিটি দলীয় সরকারেরই পেটোয়া বাহিনী ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
পুলিশ শব্দের প্রথম অক্ষরের অর্থ হইল পিস—অর্থাত্ শান্তি। কিন্তু জনমানসে তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত এই ভাবমূর্তি অতি প্রাচীন। প্রথাগত ভীতি এইরূপ যে, বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা। উত্তরাধিকার সূত্রেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলি এই ভাবমূর্তি ধারণ করিতেছে। তাহার পরও যেই কনসেপ্ট হইতে পুলিশের সৃষ্টি, তাহার মূল কার্যক্রম আমাদের দেশেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে একদম হতাশাজনক নহে। একটি সুষ্ঠু সমাজের পুলিশ উত্পীড়ক হইবে না, হইবে মানুষের বন্ধু—এমন স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার পূরণ শতভাগ আশা করিবার পূর্বে আমাদেরও ভাবিয়া দেখা উচিত তাহাদের সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতা লইয়া।
তাহারা সরকারদলীয় পেটোয়া বাহিনী—এই সমস্যা পুলিশের নহে, আমাদের রাজনীতিকদের। রাজনীতিকরাই নানাভাবে পুলিশকে নিজেদের ক্ষমতার প্রতাপে ব্যবহূত হইতে বাধ্য করে। এই চিত্র সব সরকারের আমলেই দৃশ্যমান। কিন্তু ইহার বাহিরেও পুলিশ অসংখ্য ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় নিরন্তর সেবা প্রদান করিতেছে। বিশ্বের অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তুলনায় আমাদের পুলিশের জীবন-জীবিকা, বেতন-ভাতা, আবাসন ব্যবস্থা, যানবাহন, চিকিত্সা-বিনোদনসহ অসংখ্য বিষয়াদির ভিতরে আমরা এক করুণ চিত্র দেখিতে পাই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, প্রায় আট হাজার পুলিশ সদস্যের আবাসস্থল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস; তবে সেইখানে কোনো পুলিশ সদস্যের নির্দিষ্ট কোনো বিছানা নাই। পালা করিয়া একাধিক পুলিশ সদস্য থাকেন একেকটি বিছানায়। ছারপোকার কামড় তাহাদের নিত্যসঙ্গী। ব্যারাকে ঘুমানোর মতো নির্দিষ্ট কোনো আসন বরাদ্দ নাই এমন পুলিশ সদস্যের হার কমপক্ষে শতকরা ২৫ ভাগ। কেবল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস নহে, একই চিত্র দেশের প্রায় প্রতিটি পুলিশ লাইনসের পুলিশ সদস্যদের। এক ঈদে ছুটি মিলিলে আরেক ঈদ হয় ছুটিশূন্য। সারা দিন খাটুনির পর রাতে ব্যারাকে ফিরিয়া অনেক সময়ই পানি-বিদ্যুতের দেখা মেলে না। অনেক সময় বাধ্য হইয়া নোংরা পোশাকেই আবার ডিউটিতে বাহির হইতে হয়। তাহারা যেন মনুষ্য পদবাচ্যের নহে! প্রদীপের পাদদেশে যে অন্ধকার লুকাইয়া থাকে, ইহা যেন তাহাই। অথচ যে কোনো ধরনের ঝুঁকির কাজ করিতে তাহারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন। এই অস্থির রাজনৈতিক সময়ে একের পর এক সহিংসতা, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ-অবরোধ এবং হরতালসহ সকল কিছুর মোকাবিলায় প্রধান ভূমিকা পালন করিতে হয় এই পুলিশকেই। রমজান ও ঈদকে সামনে রাখিয়া সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, চোর, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞানপার্টির তত্পরতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ভরসা ওই পুলিশই। নিশ্চয়ই পুলিশ প্রশাসন তত্পর থাকিবার পরও ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও চুরির ঘটনা ঘটিতেছে নিত্য। কিন্তু এমন যদি কখনো দেখা যায় যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীশূন্য হইয়াছে এই দেশ! তখন আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা দূরের কথা, ন্যূনতম স্বাভাবিক জীবনও বিপন্ন হইয়া পড়িতে বিলম্ব হইবে না। মনে হইবে যেইটুকু অরাজকতা ও সমস্যা এতকাল ছিল তাহা নদীর কাছে এক বালতি পানি মাত্র।
পুলিশের যে সঙ্কট-সমস্যা রহিয়াছে, তাহা রাতারাতি ঠিক হইবে না। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্রমশ নিশ্চয়ই পুলিশ শব্দের যথার্থ ধারক হইয়া উঠিবে। তাহারা আমাদের সমাজেরই অংশ। এবং এই সমাজব্যবস্থায় যত অব্যবস্থাপনা ও মানসিক দৈন্য রহিয়াছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও তাহার ঊর্ধ্বে উঠিতে পারিবে না রাতারাতি, ইহাই স্বাভাবিক। তাহারা আমরাই এবং আমরাও তাহারা—সুতরাং কাহার নিন্দা করিব আমরা?
