পুষ্টি চাল প্রকল্প প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪১
বাঙালি সারাদিনে পেট পুরিয়া সব খাইলেও তাহা কোনো খাওয়ার পদবাচ্যই হইবে না, যদি সেই তালিকার ভাত না থাকে। নানা খাবারে পেট আইঢাই হইলেও দুই মুঠো ভাতের জন্য প্রাণ হাহাকার করিয়া ওঠে আমাদের। ভেতো বাঙালি বলিয়া আমাদের যে বদনাম রহিয়াছে, তাহা সর্বাংশে নিন্দুকার্থে নহে। ভাতের ভিতরে বৃহদাংশে রহিয়াছে একপেশে কার্বহাইড্রেড। সুতরাং বৃহত্ এক থালা ভাতের সহিত সামান্য সবজি তরকারির আহার আমাদের সুষম খাদ্যের ধারেকাছে যাইতে পারে না। যাহারা কায়িক শ্রম দিয়া জীবিকা অর্জন করেন, তাহাদের এই বিপুল কার্বহাইড্রেড পুড়িয়া শক্তি উত্পাদনে ব্যয় হইবার সুযোগ থাকে। তাহার পরও অপুষ্টি তাহাদের শরীরে দিন দিন ভাঙন আনে নীরবে। আর যাহাদের কায়িক শ্রমের বিশেষ বালাই নাই, তাহাদের ওই অধিক কার্বহাইড্রেড কোথায় যাইবে? কয়েক দশক পূর্বের ঢেঁকিছাঁটা চালও উত্পাদিত হয় না আগের মতো, কলে ছাঁটা চালের রহিয়াছে নানা ধাপ-প্রক্রিয়া, তাহাতে আগেকার পুষ্টিমানও হারাইয়া যায়। সব মিলিয়া এক্ষণে অধিক পরিমাণে ভাত-ভক্ষণ-নির্ভর খাদ্যাভ্যাসের কারণে অস্বাস্থ্য ও অপুষ্টি আমাদের জনগোষ্ঠীর শরীর-লিখন হইয়া গিয়াছে। যাহা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য সহায়ক নহে মোটেই। মানুষের জীবন চক্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় যেমন—শিশুকাল, শৈশবকাল, কৈশোর, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদানকাল ও বয়োসন্ধিকালে বিশেষ প্রয়োজনীয়, পরিমিত ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ অত্যাবশ্যক। বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক অবস্থা ও দৈহিক ক্রিয়াকর্ম অনুযায়ী এই খাদ্যচাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হইয়া থাকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা কম কিংবা অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ অপুষ্টিজনিত রোগের কারণ হয়। তাই জীবনের সকল পর্যায়ে আমাদের পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ নি:সন্দেহে অতি জরুরি। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীর অপুষ্টির সমস্যা কিছুটা দূর করিতে এইবার ভিটামিন ও খনিজ লবণ সমৃদ্ধ চাল উত্পাদন শুরু হইয়াছে, যাহার নাম ‘পুষ্টি চাল’। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি যৌথভাবে ভারনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) কর্মসূচির আওতায় চীন হইতে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি-১, ভিটামিন-১২, ফলিক এসিড, আয়রন এবং জিংক মিশ্রিত দানা আনিয়া প্রতি সাধারণ চালের ১০০ দানার মধ্যে ১টি কৃত্রিম দানা মিশ্রিত করিয়া এই ‘পুষ্টি চাল’ উত্পাদনের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। ইহার সংরক্ষণ এবং রন্ধন পদ্ধতিও অন্যান্য চালের মতোই। এই প্রকল্পে দাবি করা হইতেছে, আমাদের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ যে খাদ্য-উপাদানের ঘাটতি থাকে তাহা এই ‘পুষ্টি চাল’ পূরণ করিতে পারিবে। কর্মঠ ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করিয়া এই পুষ্টি চালের মাধ্যমে সর্বাধিক সুফল পাইবে এইদেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী। কারণ প্রথাগতভাবে কলে-ছাঁটা চালে পুষ্টি উপাদান খুব সামান্যই থাকে, যাহা মূলত শর্করার প্রধান উত্স হিসাবে কাজ করে। পরীক্ষামূলকভাবে তিন মাস এই চাল বিতরণের পর ফলাফল ভালো পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে দেশের ভিজিডি কর্মসূচির সাড়ে ৭ লাখ উপকারভোগী পরিবারের মধ্যে এই চাল বিতরণ করা হইবে। পুষ্টি চালের প্রস্তুতকারক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিএসএম’ মনে করিতেছে, তাহাদের উদ্ভাবিত এই চালের প্রযুক্তি বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাইতে এক অভাবনীয় সুযোগ আনিয়া দিয়াছে। তবে বাংলাদেশ আপাতত এই চালের ব্যবহারিক গবেষণাগার, সফলতার চিত্র সুন্দর হইলে এশিয়ার অন্য দেশেও ডিএসএম এই প্রকল্প চালু করিবে। কিন্তু আমাদের জনগোষ্ঠী এক্ষণে এত ব্যাপকহারে অপুষ্টির শিকার হইত না, যদি আবহমান কালের নিয়ম অনুযায়ী আমরা ঢেঁকি ছাঁটিয়া উত্পাদন করা চাল উদরস্থ করিতাম। নানা কারণে আমরা প্রযুক্তি নির্ভর হইয়াছি কিছু সঙ্কট মোকাবিলা করিতে, কিন্তু সেই প্রযুক্তির কারণেই আরো বৃহত্ কিছু সঙ্কট আমরা নিজেদের আঙিনায় টানিয়া আনিয়াছি। সেই সঙ্কট সমাধানে আবার দ্বারস্থ হইতেছি সেই প্রযুক্তির কাছেই। তাহাছাড়া কৃত্রিম ভিটামিন-মিনারেল অনেক ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক খাদ্যের মতো মানব শরীরে যথাযথভাবে শোষিত হইতে পারে না। যাহা হউক, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হইল জনগোষ্ঠীর অপুষ্টি দূরীকরণ, তাহা সফল হউক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন