ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছরের মাথায় ধর্ম নিরপেক্ষ আর উদারপন্থীদের বিক্ষোভের মুখে গত ৩ জুলাই সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর মুসলিম ব্রাদারহুড তথা মুরসির বিরোধীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছিল। তারা মনে করেছিল, সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানে হয়তো তাদের দাবি পূরণ হয়েছে। আগামী নির্বাচনে তাদের সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। সেনাবাহিনীও সে ধরনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর বর্তমান আচরণে নির্বাচন করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সংঘাত, নিপীড়ন যেন অতীত স্বৈরশাসনকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
প্রায় আড়াই বছর আগে গণতান্ত্রিক চেতনাকে ভিত্তি করে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন ঘটিয়েছিল মিসরীয়রা। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হটানোর পর সে চেতনা শেষ হবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কারণ মুরসি কোনো স্বৈরশাসক নন বরং মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট তিনি। যে গণতন্ত্রের জন্য মিসরীয়রা আরব বসন্তের সূচনা করেছিল মুরসিকে হটানোর মাধ্যমে তাদেরই একটি অংশ গণতান্ত্রিক চেতনার অবমূল্যায়ন করেছে। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে তারা অগ্রাহ্য করেছে। যা কিনা মেনে নিতে পারেনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকরা।
একদিকে যখন তাহরির স্কয়ারে বিরোধীরা মুরসির পদত্যাগের জন্য আন্দোলন করছিল কায়রোর অন্য প্রান্তে তখন আন্দোলন করছিল মুরসি সমর্থকরা। কিন্তু বিশ্ব গণমাধ্যম তখন বিরোধীদের পক্ষে ছিল। বিশ্ব সম্প্রদায় তখন বিরোধীদের সমর্থন দিয়েছে। যে কারণে মুরসির পতন হয়ে দাঁড়ায় সময়ের ব্যাপার। নির্বাচিত মুরসি তখন নিরুপায়। কিন্তু গণতন্ত্রের পথে মুরসির ক্ষমতায় থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে মনে করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকরা।
মুরসির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিন থেকেই তারা আন্দোলন করছে। তাদের দাবি মরসিকে ক্ষমতায় আনার পর বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। এজন্য এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে তাদের। রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে মিসরের রাজপথ। বলা যায় গৃহযুদ্ধের পথেই হাঁটছে মিসর। এক অনিশ্চিত বিপন্ন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে মিসরীয়রা।
মুরসি বিরোধীরা এখন নিরব। তাহরির স্কয়ারে এখন তাদের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। তাদের আন্দোলনের মুখেই কিছুদিন আগে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। আর এখন অন্য মিসরীয়দের দাবিকেই পদদলিত করছে তারা। এরই মধ্যে প্রায় ৯শ’ মানুষ সোনা ও পুলিশের হাতে জীবন দিয়েছে। গত বুধবার মিসরে মুরসির সমর্থকদের হটাতে সরকারি বাহিনীর অভিযানে সরকারি হিসেবে ৬৩৮ জন মারা গেছে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি নিহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। আর শুক্রবার জুমার নামাজের পর আবারো বিক্ষোভের জন্য জড়ো হলে পুলিশের গুলিতে প্রায় ১৭০ জন মারা গেছে।
মিসরের বর্তমান সরকার ১ মাসের জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এদিকে, আন্তর্জাতিক মহলের নিন্দা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী অনমনীয় আচরণ করছে। ইতিমধ্যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংযত আচরণের জন্য উভয়পক্ষের প্রতি আহবান জানিয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের দমাতে পারেনি সেনাবাহিনী। বরং তারা সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে দমন-পীড়ন করে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নির্মূল করা যাবে না। তবে দুই পক্ষই একটি বিষয়ে নিশ্চিত তা হলো মিসরের ভবিষ্যত্ এখন বিপন্ন। যে বিভক্তির জন্ম হয়েছে তা পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।
মুরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ক্ষমতায় আসার পর তারা ভালোভাবে দেশ চালাতে পারেননি। তারা শুধু নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার চিন্তা করেছেন। দেশের অর্থনীতির কথা ভাবেননি। তারা বিশৃঙ্খল ও দলীয় মনোভাব নিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন।
ক্ষমতায় আসার জন্য মুসলিম ব্রাদারহুড ১৯২৮ সাল থেকে লড়াই করে আসছে। ক্ষমতায় আসার পর তারা নিজেদের চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী দেশ চালানোর চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। তবে তারা জাতীয় ঐক্য গঠনের বিষয়ে জোর দেয়নি। আর এখন সেনা প্রধান জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি এবং তার সমর্থকেরা এখন একই কাজ করছে। সেনাবাহিনী বলছে তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু মানুষ হত্যার যে নজির তারা দেখাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডকে তারা নিশ্চিহ্ন করতে চায়।
১৮ মাস আগেও আরব বসন্তের বড় বিজয়ী হিসেবে নিজেদের বিবেচনা করতো মুসলিম ব্রাদারহুড। নির্বাচনে সে সফলতার পরিচয়ও তারা দিয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিয়ে আরব বিশ্বসহ পশ্চিমাদের কিছু স্বার্থ কাজ করছে। যে কারণে ব্রাদারহুডের উপর আরো আঘাত আসতে পারে। যদিও এ প্রক্রিয়া কায়রোর কোনো সমস্যার সমাধান দেবে না। বরং দিনকে দিন সমস্যা আরো তীব্র করে তুলবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতায় মিসরীয়দের আকাশ ছোয়া প্রত্যাশা শূূন্যে মিলে গেছে। এখন দরকার মিসরীয়দের বিভক্তির পথে নয় সামাজিক শান্তির পথে অগ্রসর হওয়া। যদিও এটা এখন অনেকটাই অসম্ভব। তাদের বিরোধটা এখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। যেটা সত্যিই বড় ট্রাজেডি।
