সেই দিনটি আজো আমাদের শিহরিত করে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সম্মুখে সেইদিন যেই ট্র্যাজিডি সংঘটিত করা হইয়াছিল সেই বীভত্সতার কথা মনে হইলে কাঁপিয়া ওঠে বুক। দিনটি ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী এক সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দিতেছিলেন দলীয় সভানেত্রী ও তত্কালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা। ঠিক তখনই চতুর্দিক হইতে একের পর এক ছুঁড়িয়া মারা হয় বিদেশে তৈরি বেশকিছু শক্তিশালী গ্রেনেড। মূলত আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যেই যে কাপুরুষোচিত এই হামলা চালানো হইয়াছিল তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বাঁচিয়া গেলেও গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হইয়া গিয়াছিল অনেক নেতাকর্মীর দেহ। আর মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাইয়াছিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন। আহত হইয়াছিলেন আরও শতাধিক। দলটির বহু নেতা-কর্মী-সমর্থক এখনও তাহাদের শরীরে সেই ভয়াবহতার অমোচনীয় স্মারকচিহ্ন হিসাবে বহন করিয়া চলিয়াছেন গ্রেনেডের মারাত্মক স্প্লিন্টার। রাজনীতির ক্ষেত্রে যতো মতপার্থক্যই থাকুক, বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষমাত্রই যে এই ধরনের বর্বরতাকে চরম ঘৃণার চোখে দেখিবেন—তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সঙ্গত কারণেই আশা করা হইয়াছিল যে, দলমত নির্বিশেষে সকলেই ইহার বিরুদ্ধে সোচ্চার হইবেন। সর্বোপরি, সরকার এই ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব গ্রহণ করিবে। আইন তাহার স্বাভাবিক গতিতে চলিবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গৃহীত হইবে আইনানুগ ব্যবস্থা। কিন্তু নৃশংসতম এই ঘটনা লইয়াও বাস্তবে কী নির্দয় প্রহসন হইয়াছে—তাহা দেশবাসীর অবিদিত নহে। এই ব্যাপারে বেশিকিছু বলিবার অবকাশ নাই। কারণ বিষয়টি এখনও বিচারাধীন আছে।
প্রায়শ বলা হইয়া থাকে যে, অপরাধীর কোনো দল নাই। কথাটি সত্য। কোনো অপরাধ সংঘটিত হইলে রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব হইল তাত্ক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় এই ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বই বহন করে না। ইহাই আইনের শাসনের প্রথম কথা। গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটিই চলিয়া আসিতেছে যুগ যুগ ধরিয়া। বলা বাহুল্য, যখনই ইহার ব্যত্যয় ঘটে অর্থাত্ আইনকে তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে দেওয়া হয় না—তাহার অভিঘাত শুধু ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ধীরে ধীরে তাহা গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই কলুষিত করিয়া ফেলে। দেখা দেয় আস্থার সংকট। দুর্বল হইয়া পড়ে আইনের শাসনের ভিত। আর তাহার পরিণতি কতোটা বিপজ্জনক হইতে পারে—তাহা আমাদের রাজনীতিকদেরও অজানা নহে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হইল, একুশে আগস্টের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হইতে কেহই কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া মনে হইতেছে না। আমাদের উদ্বেগ সেইখানেই।
বলা অনাবশ্যক যে, একুশে আগস্টই একমাত্র দৃষ্টান্ত নহে। স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকে বহু মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করিতে হইয়াছে দেশবাসীকে। সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বলি হইতে হইয়াছে দেশবরেণ্য বহু মানুষকে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ন্যক্কারজনকভাবে বাধাগ্রস্ত করা হইয়াছে বিচার প্রক্রিয়াকে। ফলে নৈরাজ্যের আশঙ্কা বাড়িতেছে। সেইসাথে চড়িতেছে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সংঘাতের পারদ। কিন্তু যাহারা কার্যকরভাবে এই আত্মঘাতী ও চরম বেদনাদায়ক পরিণতির লাগাম টানিয়া ধরিতে পারিতেন তাহাদের বোধোদয় হইতেছে না। অবস্থা অনেকটা—যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ! তবে যাহারা মনে করেন যে, দুই নেত্রী একত্রে বসিয়া বৈঠক বা সংলাপ করিলেই এই অবস্থার অবসান ঘটিবে—আমরা তাহাদের সহিত একমত নহি। বস্তুত আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হইল সর্বাপেক্ষা বড়ো চ্যালেঞ্জ। রাজনীতির প্রভাব যে সর্বব্যাপী তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। তবে সুশাসনের স্বার্থে সজ্ঞানেই কিছু কিছু বিষয়কে রাজনীতির হস্তক্ষেপযুক্ত রাখা উচিত। একুশে আগস্টের মতো চরম দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করিতে হইলে আইনকে অবশ্যই তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতে দিতে হইবে। সর্বোপরি, সকলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে অবারিত করিতে হইবে গণতন্ত্রের পথ। মনে রাখিতে হইবে যে, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য।
