সম্প্রতি জন্মাষ্টমী উদযাপন কমিটি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটি এবং হিন্দু ধর্মীয় নেতারা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহিত সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাহাদের অভয় দান করিয়া বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক গোষ্ঠী সংখ্যালঘু লোকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় বলে আপনাদেরকে দৃঢ় মনোবল নিয়ে বসবাস করতে হবে।’ সেই সঙ্গে তিনি ইহাও বলেন যে, আমরা সম্মিলিতভাবে দেশ স্বাধীন করিয়াছি। তাই আমাদের একসঙ্গে দেশ গড়িতে হইবে।
বাংলাদেশের সংবিধানে (ধারা ২৭, ২৮, ৩২ ও ৪১) ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার স্বীকৃত। এই প্রেক্ষিতে কে সংখ্যাগরিষ্ঠ আর কে সংখ্যালঘু এই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। নাগরিক হিসাবে ও আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার। সর্বক্ষেত্রে আমাদের এই বিবেচনাবোধই মুখ্য হওয়া উচিত। এমতাবস্থায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনরূপ হীনমন্যতাবোধের অবকাশ নাই। দেশের সংবিধানে সর্বদিক দিয়া তাহাদের সুরক্ষা দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু বাস্তবে এই দেশে অনেক ক্ষেত্রেই ইহার বিপরীত চিত্র পরিলক্ষিত হইতেছে। এখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত না হওয়ায় এবং আইনের শাসন উপেক্ষিত হওয়ায় ঐসব সম্প্রদায়ের মন হইতে ভয়-ভীতি দূর হইতেছে না। একটা দেশে গণতন্ত্র কতটা কার্যকর তাহা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্মান ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের অনেক সময় আন্তরিকতার অভাব দেখা যায়। সাধারণ মানুষ অসাম্প্রদায়িক হইলেও রাজনৈতিক কারণে কখনও কখনও তাহাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। বিশেষত নির্বাচনের প্রাক্কালে বা ক্ষমতার পালাবদলের সময় তাহারা অধিক হারে ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন। এই পরিস্থিতি জাতি হিসাবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
এমন প্রেক্ষাপটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উক্ত আশ্বাসের তাত্পর্য অপরিসীম। তাহার বক্তব্যে ঐ সকল সম্প্রদায় নিঃসন্দেহে সন্তুষ্ট। তাহারা নতুন আশার বাণী শুনিলেন। কিন্তু তাহার পরও সকলের মনে প্রশ্ন থাকিয়া যায়। যদিও প্রধান নির্বাহীর যে কোন আদেশ-নির্দেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট লোকদের জন্য শিরোধার্য। তথাপি তাহার হুকুম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হইবে তো? সাম্প্রতিককালে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মন্দিরে রাতের অন্ধকারে হামলা করা হইয়াছে। কিন্তু দুর্বৃত্তরা ধরা পড়ে নাই। তাহাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয় নাই। চট্টগ্রামের রামু বৌদ্ধ মন্দিরে ন্যক্কারজনকভাবে হামলা করা হয় এই সরকারের আমলে। সুখবর হইল সরকারের আন্তরিকতা ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত রামু বৌদ্ধ মন্দির পুননির্মাণ করা হইয়াছে। কিন্তু দুষ্কৃতকারীদের শাস্তি হয় নাই। তাহাছাড়া এখন এই সব সম্প্রদায়ের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের শিকার হইতেছেন। সম্প্রতি বরিশালের স্বরূপকাঠিতে কৃষকলীগ নেতা আশিস বড়ালের উপর নির্মম হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। তিনি ন্যায়বিচার পাইবেন দূরের কথা, উপরন্তু দুর্বৃত্তদের ভয়ে পালাইয়া বেড়াইতেছেন। এই ব্যাপারে থানায় মামলা-মোকদ্দমা করা হইলেও যথাসময়ে চার্জশিট দেওয়া হইতেছে না। যাহারা অন্যায়কে ও ঘৃণ্য অপরাধকে এভাবে প্রশ্রয় দিতেছে তাহাদের ব্যাপারে সরকার কি সচেতন আছেন? স্থানীয় প্রশাসন চুনোপুটিদের তোয়াজ করিয়া চলিলে শুধু সংখ্যালঘু কেন সংখ্যাগরিষ্ঠরাও শান্তিতে ঘুমাইতে পারিবেন না।
অতএব, দেশ চলিবে প্রধান নির্বাহীর নির্দেশেই। এমপি ও জেলা কোঅর্ডিনেটররা সেই নির্দেশ অবশ্যই মানিয়া চলিতে বাধ্য। আবার প্রশাসনের কেহ যদি সরকার প্রধানের কথাকে পাত্তা না দেন, তাহা হইলে তাহার বিহিত করিতে হইবে। সরকার প্রধানের যে কোন নির্দেশকে মাঠ পর্যায়ে পুরাপুরি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে পালন করিতে হইবে সক্রিয় ভূমিকা। তাহা না হইলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অর্থ দাঁড়াইবে যেই লাউ সেই কদু। চুনোপুটিদের আস্কারা দেওয়া হইলে দেশে কখনও শান্তি আসিবে না। এই অবস্থায় ঐ সব সম্প্রদায় মঙ্গল কামনায় যতই মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলিত করুন না কেন, শেষপর্যন্ত কাহারোই মঙ্গল হইবে না।
