নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা নানাভাবে বিভক্ত। বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ছাড়াও দেশে চালু রহিয়াছে মাদ্রাসা শিক্ষা। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পাশাপাশি আছে কিন্ডারগার্টেন ও এনজিও পরিচালিত স্কুল। বিদ্যালয়ে আজকাল নৈতিক শিক্ষা তথা সুস্থ-সুন্দর জীবন যাপনের পথনির্দেশ; আরও স্পষ্ট করিয়া বলিলে যথার্থ মানুষরূপে গড়িয়া উঠার জন্য চরিত্র গঠনের উপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হইতেছে না। পারিবারিকভাবেও নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলী বিকাশের শিক্ষা দেওয়া হইতেছে না। নাড়িছেড়াঁ আত্মজার খঞ্জরে পিতা ও মাতা একই সঙ্গে নিহত হইবার মর্মান্তিক ঘটনার পর বিবেকবান মানুষমাত্রই উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া চলিয়াছেন। কিশোর-তরুণদের মধ্যে অনেকেই আজ কেমন করিয়া মানবিক বোধ-বিবেচনা রহিত হইয়া পড়িয়াছে বা পড়িতেছে সে এক কঠিন-জটিল প্রশ্ন হইয়া দেখা দিয়াছে। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজ চিন্তাবিদগণ বিষয়টিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া জবাব খুঁজিতেছেন। কেহ কেহ বলেন, সুস্থ বিনোদন ও সুকুমার বৃত্তি বিকাশের যে সুযোগ-সুবিধা অতীতে ছিল তাহা বর্তমানেকালে নাই বলিলেই চলে। নৈতিকতা ও সুকুমার বৃত্তির অনুশীলনের ক্ষেত্রে পরিবারের পরই কার্যকর অবদান রাখিতে পারে বিদ্যালয় । প্রাথমিক হইতে শুরু করিয়া মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে নৈতিক মূল্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢালিয়া সাজানো এখন সময়ের দাবি। এক শ্রেণীর কিশোর-কিশোরী ভূত-ভবিষ্যত্ চিন্তা না করিয়া গা ভাসাইয়া দিতেছে গড্ডলিকা প্রবাহে। মাদকাসক্তিসহ নানাবিধ অনাচারে জড়াইয়া পড়িতেছে তাহাদের অনেকেই। কিশোর-যুবকদের আরেকটা শ্রেণী টেন্ডারবাজি, খুন-খারাবি ও লুটপাটের সহিত যুক্ত হইয়া পড়িতেছে। ইহার ফলে সমাজে এক অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হইতেছে। সমাজ-সভ্যতার স্বাভাবিক বিকাশের পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হইয়া আসিতেছে যেনবা। এই পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দায় নেহায়েত্ কম নয়। দুঃখজনক হইলেও সত্য, এক শ্রেণীর শিক্ষক-শিক্ষিকা কেবল পুস্তক দেখিয়া পাঠদান কিংবা মাল্টিমিডিয়ার সাহায্যে প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে শিক্ষাদান করিয়াই তাহাদের দায়িত্ব শেষ করিতে চান। শিক্ষার্থিগণের মানসিক বিকাশের বিষয়ে তাহারা মোটেও মনোযোগী নহেন। অথচ ছেলেমেয়েদের চিত্তবিকাশ না ঘটিলে, ভাল ও মন্দের বিচারবোধ না জন্মাইলে কাহারও পক্ষে যথার্থ শিক্ষিত হইয়া ওঠা সম্ভব নহে। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হইল সুপ্ত মানবিক গুণাবলীর সম্যক বিকাশ। সেইসব গুণের যথাযথ বিকাশ ঘটিলে স্ব স্ব ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানুষ যেমন হইয়া ওঠেন দক্ষ, তেমনই তাহার বিকশিত নৈতিক বুদ্ধি জীবনের সুন্দরতর পথে চালিত করে। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্ির্মতা ইত্যাদি গুণেরও বিকাশ ঘটে, ব্যক্তিত্বে বহিঃপ্রকাশ ঘটে চারিত্রিক দৃঢ়তা, যাহা দেশ ও জাতি গঠনে সহায়ক হয়। এমতাবস্থায় বাংলা মাধ্যম এবং মাদ্রাসার ক্ষেত্রে দশম শ্রেণী পর্যন্ত নৈতিকতা, চরিত্র গঠনমূলক পাঠক্রম চালু করা আবশ্যক। মানবিকতা ও সুকুমার বৃত্তি বিকাশে সহায়ক কর্মকান্ড প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পরিচালিত হওয়া উচিত। ইংরেজি মাধ্যমের ক্ষেত্রেও অন্তত সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যাইতে পারে। প্রসঙ্গত বলা বাঞ্ছনীয় যে, ইংরেজি মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণী হইতে কেমব্রিজ বা এডএক্সেলের সিলেবাস অনুসরণ করা হইয়া থাকে। স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোয় নিয়মিতভাবে খেলাধুলার চর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিশোর-কিশোরীরা যাহাতে মাদকাসক্ত হইয়া না পড়ে কিংবা অন্যকোনো প্রকার অনৈতিক কার্যকলাপের সহিত যুক্ত হইয়া না পড়ে সেই জন্যে পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সচেতন দৃষ্টি রাখা একান্ত কর্তব্য। শিক্ষক সমাজকে বর্তমানের নূতন প্রজন্মের জিজ্ঞাসা ও মূল্যবোধ গঠনে সহায়তা প্রদানকারীর ভূমিকা পালন করিতে হইবে। প্রত্যেকে যাহাতে তাহাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে সেই জন্যেও ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে। ইন্টারনেটের এই যুগে শিশু বয়স হইতেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশাল জ্ঞানভান্ডারের ভাল দিকটাই যাহাতে শিশুরা ব্যবহার করিতে পারে, সেইদিকে খেয়াল রাখিতে হইবে। আসলে চরিত্র গঠন, নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিকতাসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার কোন বিকল্প নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন