তিনি ইতিমধ্যে ডিগবাজিবিশারদ হিসাবে ব্যাপক নাম কুড়াইয়াছেন। এককোষী প্রাণী অ্যামিবা ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়। বহুরূপী এই নেতার নিত্যপরিবর্তনশীল রূপ দেখিয়া অ্যামিবাও সম্ভবত বিস্মিত বোধ করিবে। কতো রূপেই না তাহাকে দেখিবার সৌভাগ্য হইয়াছে এই জাতির! কখনো সেনাপতি, কখনও কবি, কখনও প্রেমিক। কখনও ধর্মরক্ষার জন্য কাঁদিয়া বুক ভাসাইতেছেন, আবার পরক্ষণেই জড়াইয়া পড়িতেছেন অভাবনীয় সব কেলেঙ্কারির সহিত। ইহার পর দীর্ঘ দুইযুগ অতিক্রান্ত হইতে চলিয়াছে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় গড়াইয়া গিয়াছে বহু জল। কিন্তু সেনাপতি হইতে অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রপতি হইয়া রাজনীতিকে রূপান্তরিত এই নেতার বহুরূপী চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয় নাই। বরং তিনি যেন এখন নিজের অতীত রেকর্ড ভাঙিয়া নূতন রেকর্ড সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইয়াছেন। আর তাহারই সর্বশেষ দৃষ্টান্তটি তিনি স্থাপন করিয়াছেন গত বুধবার। সকালে সিলেটে অনুষ্ঠিত দলীয় সম্মেলনে তিনি বলিয়াছেন যে, বিএনপি না আসিলে তিনিও নির্বাচনে অংশ নিবেন না। কারণ এই ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিলে তিনি ‘দালাল’ বলিয়া চিহ্নিত হইবেন। অতএব, তাহার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণাটি ছিল: ‘ধ্বংস হইয়া যাইব, তবুও দালাল হইব না’। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে তাহার সুর বদলাইয়া গিয়াছে। বিকালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অপর একটি সভায় তিনি বলিয়াছেন যে, নির্বাচন হইলে তিনি অবশ্যই অংশগ্রহণ করিবেন। দলীয় প্রধানের এই ভোজবাজি দেখিয়া তাহার দলের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন নেতা-কর্মীরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছেন। বস্তুত তিনি রাজনীতিক নহেন। তাহা না হইলেও পাওয়ার প্লেয়ার হিসাবে ভূমিকা রাখিয়া যাইতে তিনি সদা তত্পর। তাহার ডিগবাজি সেই খেলারই অংশ বৈ নয়।
আমাদের গণতন্ত্র বয়সে নবীন। এমনিতেই তাহার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পদে পদে প্রতিবন্ধকতা। গণতন্ত্রের শত্রুরাও যে বসিয়া নাই তাহার আলামতও একেবারে অস্পষ্ট নহে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সৃষ্ট ক্ষত এখনও শুকায় নাই। এমতাবস্থায় রাজনীতির উচ্চাসনে উপবিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের এই ধরনের দায়িত্বহীন আচরণ গণতন্ত্রকে কতোটা বিপন্ন করিয়া তুলিতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। অপরিপক্ব বা অপরিণত বয়স্ক কেহ অনুরূপ আচরণ করিলে তাহা উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু বয়সে অতি প্রবীণ এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে দীর্ঘদিন দৌর্দণ্ডপ্রতাপে দেশ শাসন করিয়াছেন এমন একজন ব্যক্তি যদি ন্যূনতম কোনো নীতি-নৈতিকতার পরোয়া না করেন তাহা হইলে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ভরসা রাখিবে কোথায় আর শিখিবেই বা কী? দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, যত দিন যাইতেছে রাজনীতি হইতে সর্বপ্রকার নীতিনৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা ততই যেন অপসৃত হইতে চলিয়াছে। অথচ এই রাজনীতিই একদিন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল হইতে মানুষকে মুক্ত করিয়াছে, এই রাজনীতিই পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে মানুষকে প্রেরণা জোগাইয়াছে, আনিয়া দিয়াছে স্বাধীনতা। রাজনীতিকে নীতির রাজা বলিয়া বিবেচনা করা হয়। রাজনীতিবর্জিত গণতন্ত্র আর সোনার পাথরবাটি সমার্থক। রাজনীতিতে অনুপ্রবেশকারী কতিপয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিবিশেষের নীতিনৈতিকতাহীন আচরণের কারণে বীতশ্রদ্ধ হইয়া জনগণ রাজনীতিবিমুখ হইয়া পড়িলে তাহার পরিণাম যে গণতন্ত্রের জন্য কতোটা বিপজ্জনক হইতে পারে তাহা আমরা দেখিয়াছি। অতএব, রাজনীতির অঙ্গনকে যাহারা কলুষিত করিয়া চলিয়াছেন তাহাদের চরিত্রের বদল হউক বা না হউক— জনগণকেই সতর্ক থাকিতে হইবে। অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করিতে হইবে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখার স্বার্থে। তবে পাওয়ার প্লেয়ার হিসাবে তিনি যত খেলাই খেলুন না কেন, পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন যে, তিনি সরকারের অনুকম্পার বাহিরে যাইতে পারিবেন না। আঞ্চলিক বৃহত্ শক্তির ইচ্ছার বাহিরে যাওয়াও তাহার পক্ষে সম্ভবপর হইবে না।
