‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণা বিন্দু বিন্দু জল/ গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল’/ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিকণা দিয়ে যেমন মহাদেশ এবং বিন্দু বিন্দু জল দিয়ে যেমন সাগরের সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়েও একটা বড় সঞ্চয়/মূলধন গড়ে তোলা সম্ভব। আর এই মূলধন দিয়েই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পক্ষে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। মানুষ আয় করে ভোগ করার জন্য। ভবিষ্যতের কথা ভেবে বর্তমানে অর্জিত আয়ের পুরোটাই মানুষ ভোগ করে না। আয়ের কিছু অংশ রেখে দেয় কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তথা ব্যাংকে। এই রেখে দেয়া অংশের নাম সঞ্চয়। ব্যক্তির সঞ্চয় নির্ভর করে দূরদৃষ্টি, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদির উপর। স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের সঞ্চয়ে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের তথা পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন করাই স্কুল ব্যাংকিং এর মূল লক্ষ্য।
স্কুল ব্যাংকিং-এ ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তারা যেন অপ্রয়োজনে অর্থাত্ অহেতুক টাকা-পয়সা নষ্ট না করে সঞ্চয়ে আগ্রহী হয়। তাদেরকে গল্পের ছলে, কবিতার ছন্দে বুঝাতে হবে, তাদের ভেতর চেতনা জাগ্রত করে তুলতে হবে যেমনটি— ছোটবেলায় সেই নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য এর লেখা কবিতাটিতে আমরা পড়েছি ছোট মৌমাছি মধু সংগ্রহে, পিপিলিকা ভবিষ্যতের শীতের সঞ্চয়ে ব্যস্ত, ঠিক তেমনিভাবে স্কুল জীবন থেকেই তারাও যেন তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে বড় সঞ্চয় তৈরি করে ভবিষ্যতের নানা দুর্যোগের হাত থেকে নিজকে এবং পরিবারকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়া আরো বুঝাতে হবে, তাদের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংকে জমা হলে সেগুলো একত্রে বড় সঞ্চয়/মূলধন সৃষ্টি হবে। সেই মূলধন নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, কল-কারখানাতে বিনিয়োগ করলে তাতে কর্মসংস্থান হবে। বিনিয়োগ মানে সঞ্চিত অর্থ যখন উত্পাদন বাড়ানোর কাজে ব্যবহূত হয় তখন তাকে বিনিয়োগ বলে। সেখানে বহু লোকের চাকরি হবে। সেক্ষেত্রে আয় হবে। আবার আয় হতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ হবে। এভাবে চাকা ঘুরতে থাকবে। একে অর্থনৈতিক চাকা বলে। এ চাকাকে কখনো থামতে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশ তথা এই জাতিকে শান্তিময় ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে এবং জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সম্পদ তথা সঞ্চয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য অভিশাপ। বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন— ‘দারিদ্র্য হলো অপরাধ ও বিপ্লবের জননী’। তাই প্রত্যেক বাবা-মা এর উচিত সন্তানকে শিক্ষা দেয়া, ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় অতি আবশ্যক। অর্থাত্ সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দরকার সুন্দর ব্যাংকিং সঞ্চয়।
সবশেষে বলব, আমাদের সুনাগরিক হতে হবে। সুনাগরিক জাতীয় সম্পদ। সুনাগরিকের সংখ্যা যে দেশে যত বেশি সে দেশ তত বেশি উন্নত। আর সেই ব্যক্তিটিই সুনাগরিক যিনি বুদ্ধি, বিবেক আর আত্মসংযমের অধিকারী। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কার্যাদি সুন্দরভাবে, সুচারুভাবে সম্পাদন করার জন্য বুদ্ধি দরকার। বিবেক হল সুনাগরিকের জাগ্রত শক্তি। আর আত্মসংযম, এটা হল সুনাগরিকের শ্রেষ্ঠ গুণ। সুতরাং, আমাদের সন্তানদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে রয়েছে অনেক দায়িত্ব, অনেক কর্তব্য। এ ব্যাপারে কখনোই নির্লিপ্ত থাকা উচিত নয়। চলুন, ছাত্র জীবন থেকেই তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলি। কেননা, আজকের ছাত্র আগামী দিনের ভবিষ্যত্। অর্থনীতির মতে অধিক সঞ্চয় থেকে অধিক বিনিয়োগ এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যা একটি সমাজের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য একান্ত অপরিহার্য।
লেখক : এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার, সোনালী ব্যাংক লিমিটেড
