দুখের সাহারা পার হয়ে আমি চলেছি কা’বার পানে
পড়িব নামাজ মারফতের আরাফাত ময়দানে
লক্ষ লক্ষ ভক্ত হূদয়ে ধ্বনিত হচ্ছে যে বাণী ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়া নিয়ামাতা লাকা লাকা আলমুলক লাশারিকা লাকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ আল্লাহ্র ঘর জিয়ারত করার সৌভাগ্য যার হলো তার হূদয় হলো তৃপ্তির সুধায় পূর্ণ। জীবনের সকল অপরাধ মাফ করে নিয়ে, তাঁর করুণাধারায় স্নাত হয়ে পুণ্যবান হওয়া আরাফাত ময়দানে। পথের কষ্টকে কষ্ট মনে হয় না, খোলা আকাশের নিচে মুজদালিফায় রাত্রি যাপন করে অনুভব করা যায় অবিনশ্বরকে। তাই তো আমরা সকলেই হজ্ব যাত্রী দেখলে সম্মান প্রদর্শন করি, তাদের কাছে দোয়া কামনা করি।
মানুষ সৃষ্টির সেরা, তাই প্রতিদিনই তার জীবনে হয় কা’বা দর্শন, যখন জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজ শুরু করে, মুহূর্তে হূদয় ধাবমান সেই পুণ্য তীর্থের দিকে। ভোগ নয়, ত্যাগ, ত্যাগের বাণী নিয়ে দেয়া হয় কুরবানী, একটি পশুর মাধ্যমে নিজের অন্তরের অশুভ শক্তিকে বিসর্জন দেয়ার নামই কুরবানী। আত্ম জিজ্ঞাসার কষ্ঠি পাথরে যাচাই করে নিতে হয় আমরা কি পারি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে।
সেকালে দেখতাম জীবনযাত্রার সহজ ছন্দে চলছে। কুরবানীর ঈদে গৃহপালিত পশুকে কুরবানী দেয়ার সময়, বাড়ির ছোটদের চোখ হতো অশ্রুসিক্ত, তারা যে মায়ার বাধনে বেধেছিল এই প্রাণীটিকে।
রাজধানীর পথে পথে ভিন্ন চিত্র, বড় বড় গরু ষাঁড় মহিষ ছাগল রঙ্গিন কাগজের মালা পরে চলছে সারি বেধে, পাশে তার গর্বিত মালিক। হাসি মুখে তিনি জানাচ্ছেন কতো মূল্যে কিনেছেন প্রাণীটিকে। এক লাখ দুই লাখ পাঁচ লাখ দশ লাখ তারও বেশি হতে পারে। কী আশ্চর্য রূপার চাকতির বিনিময়ে তো ত্যাগ হয় না, এই কুরবানীতে মিশে আছে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা, মাটিতেই পড়ে থাকবে, আল্লাহ্তায়ালার সুন্তুষ্টি অর্জন হবে না।
বিনয় নম্রতা-ভদ্রতা দিয়ে চরিত্রকে সুন্দর করে তুলতে হয়। এই শিক্ষা মানুষ অর্জন করে তার বাড়ির মুরব্বিদের কাছে, স্কুলের শিক্ষকের কাছে এবং সত্ প্রতিবেশীর সংসর্গে। ফলবান বৃক্ষ ভূমিকে স্পর্শ করে কথাটি পাঠ্য বইতে পড়ে শিখেছি। যার যতো গুণ তিনি ততো বিনয়ী হবেন। কখনোই নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাববেন না। আমি সব পারি, তুমি কিছুই পার না, আমি দেখতে সুন্দর, তুমি অসুন্দর, আমার দামি গাড়ি, তুমি চড়ো রিকশায় এমনটি যে ভাবে তার মতো মুর্খ তো কেউ নেই। আমার বলে কিছুই দাবি করতে নেই, সবই উপরওয়ালার দান, এই আছে এই নেই, যে কোন মুহূর্তে সব চলে যেতে পারে। পৃথিবী ছেড়ে চির বিদায়ের দিনে মাটির বিছানায় শেষ শয্যা সবারই এক, সেখানে তারতম্য নেই।
হজ্বে যাঁরা গেছেন দু’খন্ড সাদা কাপড়ে নিজেকে আবৃত করে, সঙ্গে সামান্য কিছু কাপড়, একটি প্লেট, একটি গ্লাস কোন বিলাসী দ্রব্য সেখানে নেই। আরাফাতের ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁবুতে বসে জিকির করছেন, মুজদালিফায় খোলা প্রান্তরে শুয়ে আছেন, উপরে অনন্ত নীল আকাশে অগণিত তারা, কাঁকর বিছানো মাটিতে তাদের আশ্রয়, মনে হয় যেন অলৌকিক কোন দৃশ্য। আমরা যারা স্বদেশে আছি আমাদের প্রার্থনায় তাদেরকে শরিক করবো। তাঁদের মুনাজাতে আমাদের জন্য ক্ষমা চাইবেন, দোয়া করবেন, দেশের দশের মঙ্গল কামনায় তাদের নয়ন হবে অশ্রুসিক্ত।
লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক
[email protected]
