দারিদ্র্য কমার হারে ধীরগতি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:৫৯
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্য কমার হার ধীরগতিসম্পন্ন বলে উল্লেখ করেছে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’। “আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস” উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বার্ষিক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য ৯ দশমিক ৮ শতাংশ হারে কমলেও পরবর্তী পাঁচ বছরে (২০০৫-২০১০) এই কমার হার ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। অর্থাত্ পরবর্তী পাঁচ বছরে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কম হ্রাস পেয়েছে। “বহুমাত্রিক পরিমাপঃ বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি ২০১৩” শিরোণামে ঐ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দারিদ্র্যের অন্য সনাতনী পরিমাপ তথা দারিদ্র্যের গভীরতা (মানুষ দারিদ্র্যসীমার কতটা কাছাকাছি) এবং দারিদ্র্র্যের ব্যাপকতা (মানুষের মাঝে ভোগের বণ্টন) ব্যবহার করলেও দেখা যায় দারিদ্র্য কমার হার হ্রাস পেয়েছে। দারিদ্র্যের গভীরতা ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ হারে কমলেও ২০০৫-২০১০ সালে এ হার ছিল ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে, গত পাঁচ বছরে (২০০৫-২০১০) দারিদ্র্যের ব্যাপকতা কমার হার ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ কিন্তু তার পূর্বের পাঁচ বছরে (২০০০-২০০৫) এ হার ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ ছিল । দারিদ্র্য পরিমাপের বিভিন্ন প্রধান পদ্ধতি; যথা— ‘আর্থিক’, ‘সক্ষমতা’, ‘অংশগ্রহণমূলক’ এবং ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ ব্যবহার করে দারিদ্র্যের গতিপ্রকৃতি দেখানো হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দারিদ্র্য পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাও চিহ্নিত করেছে। যেমন-প্রাক্কলন, নির্দিষ্টকরণ এবং নির্বাচন পক্ষপাত। মাসিক পারিবারিক আয় বৃদ্ধির শ্লথ গতি এবং মাসিক পারিবারিক ব্যয় বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয়েছে। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ২০০০ সালে ২ দশমিক ৭৯ থেকে বছরে শতকরা ১৩ দশমিক ২ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১০ সালে ৬ দশমিক ৪৮তে দাঁড়িয়েছে। মানব উন্নয়ন সূচকের মান ২০১০ সালে শূন্য দশমিক ৪৫৩ হতে প্রতিবছরে শতকরা ৪ দশমিক ৫৬ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সালে ০.৫১৫ তে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, অসাম্য সমন্বিতকরণ মানব উন্নয়ন সূচক এর মান ২০১০ সালে ছিল ০.৩৩১ যা শতকরা ৪.৩৩ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সালে ০.৩৭৪ তে উন্নীত হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মাঝে চরম দারিদ্র্য হ্রাসের হার (প্রতি বছরে শতকরা ৪.৮৭) এর তুলনায় ক্ষুধার্ত জনগণ হ্রাসের হার (প্রতি বছরে শতকরা ৩.৬৭) কম। অন্য কথায় বলা যায়, বছর বৃদ্ধির সাথে সাথে চরম দারিদ্র্যের মাঝে ক্ষুধার্তের শতকরা পরিমাণ বেড়ে চলছে। ২০১২ সালে ক্ষুধার্তের এই শতকরা পরিমাণ ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে যে, ২০১২ সালের লিঙ্গ বৈষম্য সূচকের মান অনুযায়ী বাংলাদেশ এখনো সাম্যতা থেকে অনেক পিছনে রয়েছে। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি মহিলাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মূলধন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান অনুপ্রবেশ বঞ্চিতকরণকে দায়ী করেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ প্রতিবছর বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্য হ্রাসের হার একই গতিতে হয়নি। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৯-২০০০ সালে ৩ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০০৫ সালে এ সংখ্যা বছরে ৩.৮৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ কোটি ৪১ লক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু দারিদ্র্যের হার একই সময়ে প্রতিবছর ৩.৬৭ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়ে ৪ কোটি ৯৮ লক্ষ থেকে কমে ৩ কোটি ১৫ লক্ষে পৌঁছায়। এখনো জাতিগত, বংশোদ্ভূত, ধর্ম, লিঙ্গ, বয়স, অক্ষমতা এবং অঞ্চলভিত্তিতে ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ বা প্রান্তিকীকরণ বিদ্যমান। উন্নয়ন অন্বেষণের বিশ্লেষণে বিধবা/বিপত্নিক, তালাকপ্রাপ্ত এবং পৃথক (স্বামী-স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত নয় তবে আলাদা থাকে) মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে ৫৯.৭ শতাংশ থেকে বার্ষিক ২.৮৮ শতাংশ হারে কমে গিয়ে ২০১০ সালে ৩৩.৯ শতাংশ হয়। ভূমিহীনদের মাঝে দারিদ্র্যের প্রকোপ ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল ৫৮.২ শতাংশ। ২০১০ সালে এই সংখ্যা বছরে ২.৬১ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়ে ৩৫.৪ শতাংশে দাঁড়ায়। উন্নয়ন অন্বেষণ দারিদ্র্য স্বল্পহারে হ্রাসের কারণ হিসেবে বেকারত্ব, বৈষম্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি জমি হ্রাসকরণ ইত্যাদি উল্লেখ করেছে।