আহ্ স্বস্তি!

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৩
১ অক্টোবর ২০১৩। বিশ্বের সবচে’ ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল এক নতুন ধরনের সংকট। এই সংকটের নাম দেয়া হয়েছিল ‘শাটডাউন’। কারণ, কম্পিউটারে শাটডাউন বাটন চাপার পর যেমন একের পর এক সব প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে এই শাটডাউন কার্যকর হবার পর একের পর এক অস্বস্তিকর বিপর্যয় নেমে আসতে থাকে। প্রায় সাড়ে সাত লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ঐদিন থেকে বন্ধ হয়ে যায়। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, ন্যাশনাল পার্ক, জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ, পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাসহ অগণিত সেবা সংস্থার বেশিরভাগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্ব অর্থনীতির উঠানে উঁকি দিতে থাকে আরেকটি মহামন্দার পদধ্বনি। মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো এই খবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করতে শুরু করে। আর সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ মার্কিন অর্থনীতিতে আঘাত লাগার মানেই গোটা বিশ্বে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়া। কিন্তু সেই ‘শাটডাউন’ পরিস্থিতি থেকে আপাতত ‘স্টার্টআপ’ পরিস্থিতিতে আসতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে একের পর এক বৈঠকের পর সাময়িক রেহাই পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। দফায় দফায় বৈঠক আর দর কষাকষির পর একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বন্ধ থাকা সরকারি কার্যক্রম চালু এবং সরকারের ঋণ নেয়ার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব পাস করেছে মার্কিন কংগ্রেস। এর ফলে বেকার হয়ে পড়া লাখ লাখ মার্কিনীর কর্মহীনতার অবসান ঘটেছে। তারা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছে। মুখে ফুটেছে হাসি। বেকারত্বের অবসান ঘটিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে তারা কাজে ফিরে যায়। ন্যাশনাল পার্ক, জাদুঘর, নাসা এবং অপরাপর প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসে কর্মচঞ্চল পরিবেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ১৬ দিনের এই অচলাবস্থার জন্য দায়ী করেন বিরোধী রিপাবলিকানদের। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের একগুঁয়েমির কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যেভাবে সংকটের সমাধান: যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে গত বুধবার এই ‘সমঝোতার বিল’ পাস হয় ৮১-১৮ ভোটে। বিরোধী দল রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ আগের অবস্থান থেকে পিছু হটে। তারা ক্ষমতা দেখাতে আগেরবার আমেরিকাকে বিরাট সংকটে ফেলে দিতে সক্ষম হলেও বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে তারা। ওবামাও তাদের লক্ষ্য করে একের পর এক আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। জনমতও তাদের বিপক্ষে যেতে শুরু করে। পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয় বুঝতে পেরে একসময় বিরোধী দলই আলোচনায় আগ্রহ দেখায়। ফলে গত বুধবার সরকারি দল বিলটি টেবিলে আনলে রিপাবলিকানরা আর বাধা দেয়নি। প্রতিনিধি পরিষদ ২৮৫-১৪৪ ভোটে বিলটি অনুমোদন করে। সবশেষে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ওই বিলে সই করেন। সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে দেশটিতে। এই সমঝোতা দরকার ছিল ১৭ অক্টোবরের আগেই। সেটাই হয়েছে। কারণ ঐদিনের মধ্যে বিপুল অংকের অর্থ ধার করার ছাড়পত্র না পেলে ওবামার সরকার আগের ঋণ শোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়ে যেত। যার প্রভাবে বিশ্ব আবারো ২০০৮ সালের মতো মহামন্দার হুমকিতে পড়ে যেত। তেমনটি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তা হতো প্রথম। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতত স্বস্তি ফিরলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসেনি। কারণ সরকারের ব্যয় ও ঘাটতি নিয়ে মূল আলোচনায় রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। দেশটির আইন প্রণেতারা আপাতত বিল পাস করে সঙ্কটকে কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছেন মাত্র। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত খরচ চালানোর মতো তহবিল পাবে। আর ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগের তুলনায় বেশি হারে ঋণ নিতে পারবে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ওই সময়ের মধ্যে বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আগামী বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকবার ‘শাটডাউন’ দেখতে হতে পারে। ঋণসীমা বিলটি পাস হবার পর বর্তমানে ১৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ধার করতে পারবে আমেরিকা সরকার। যুক্তরাষ্ট্র সরকার ঋণখেলাপি হলে বিভিন্ন দেশে মার্কিন বন্ডের দাম পড়ে যেত। ডলারের দরও ধরে রাখা যেত না। দেশটির ক্রেডিট রেটিংয়ে অবনমন ঘটতো। তেমন কিছু হলে অর্থনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হতো। সমস্যার শুরু যেখানে: যুক্তরাষ্ট্র সময় গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ১২টার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দ সংক্রান্ত বিলটি পাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওবামার স্বাস্থ্যবিল নিয়ে রিপাবলিকানদের বিরোধিতার কারণে তা পাস হয়নি। তাই ১৭ বছর পর ফের অচলাবস্থা হয় বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটিতে। সেবা খাতগুলো বন্ধ হয়ে যাবার পর তা সমাধানের পরিবর্তে ব্লেইম গেম নিয়ে মেতে ওঠে দুই প্রধান দল। এই পরিস্থিতির জন্য কে কার উপর দোষ চাপাতে পারে শুরু হয় তার প্রতিযোগিতা। রিপাবলিকানরা অভিযোগ তোলে, ওবামাকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাতে আমল দেননি। রিপাবলিকান হাউস স্পিকার জন বোয়েনার বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ওবামার একগুঁয়েমি এই অচলাবস্থার কারণ। অন্যদিকে, ওবামার অভিযোগ ছিল, রিপাবলিকানরা গোটা দেশকে জিম্মি করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণে এশিয়া সফর বাতিল করতে বাধ্য হন ওবামা। তারপরেও রিপাবলিকানদের সামনে মাথা নত করতে রাজি হননি তিনি। যে স্বাস্থ্যবিল নিয়ে আপত্তি ছিল বিরোধী দলের, তা প্রত্যাহার করতে বার বার অস্বীকার করেন ওবামা। তিনি বিরোধী দলের কট্টরপন্থি অংশকে ‘চরমপন্থি’ বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জনগণের ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব সরকারের। বিরোধী দল সরকারের নেয়া একটি পরিকল্পনা আটকাতে গোটা দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে না। সরকারি ও বিরোধী দলের এই লড়াইয়ের শিকার ছিল সাধারণ মার্কিনীরা। বিলটি পাস না হওয়ার কারণ ছিল প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত আইনটি। ‘ওবামাকেয়ার’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই বিলটি পাস না করতে অথবা এতে কোনো অর্থ বরাদ্দ না দিতে ওবামার প্রতি আহ্বান জানান রিপাবলিকানরা। কিন্তু বিলটি পাসে ডেমোক্র্যাটরা অনড় থাকে। তাদের ধারণা ছিল, জনগণের রোষানলে পড়ার ভয়ে রিপাবলিকানরা শেষ মুহূর্তে হলেও এতে সমর্থন দিবেন। কিন্তু তাদের ধারণা বাস্তবে রূপ নেয়নি। এর আগে ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু সেবা খাতের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়া হয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ১৯ নভেম্বর ও ১৯৯৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ জানুয়ারি দেশটির অজরুরি সরকারি কর্মকর্তাদের সাময়িক ছুটি প্রদান এবং অজরুরি সেবাগুলো স্থগিত রাখা হয়েছিল। এবার দুই দলের বিরোধের কারণ ওবামার বহুল আলোচিত স্বাস্থ্যবিল। যুক্তরাষ্ট্রে কম খরচে সবাইকে চিকিত্সা পরিসেবার আওতায় আনতে এই বিল পাসের জন্য ২০০৮ সাল থেকেই জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিলেন ওবামা। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ বিলটি আইনে পরিণত হয়। চলতি মাস থেকে তার একটা বড় অংশ কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এখানেই বেঁকে বসে বিরোধী রিপাবলিকানরা। শুরু থেকেই তারা এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল, এটি আসলে করদাতাদের অর্থের বিশাল অপচয়। সেই সঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমার সর্বনাশও। তারা বিলটি পিছিয়ে দেয়ার কিংবা প্রত্যাহারের দাবি তোলে। কিন্তু ওবামা তাতে কর্ণপাত করেননি। ফলে শুরু হয়ে যায় সংকট। মার্কিন অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রধান দুই দলের এই ‘ছেলেমানুষির’ কারণে আমেরিকার অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে কম করে হলেও দুই হাজার কোটি ডলার। এমন পরিস্থিতি যেন আর সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, আরেকবার আমেরিকা এমন পরিস্থিতিতে পড়লে বিশ্ব অর্থনীতি অনিবার্যভাবে নিরাময় অযোগ্য হোঁচট খাবে।