রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অব্যবস্থাপনা

বিপর্যস্ত পর্যটন শিল্প

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৫৮
অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা গেলেও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পর্যটন শিল্প। এখন পর্যটন মৌসুম শুরু হয়ে গেছে ভারত জুড়ে। বছর শেষে নববর্ষ ও ক্রিসমাসকে সামনে রেখে দেশটিতে পর্যটক সমাগম আরো বাড়বে বলে আশা করছে দেশটির বাণিজ্য সংগঠন অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজ অব ইন্ডিয়া। এই সময়ে শুধু ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ২০ লাখের বেশি পর্যটক সমাগম হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। ভারতের পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় ক্রমেই পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। এরই মধ্যে ভারতের বিভিন্ন হোটেল ভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ। খাদ্য ও পানীয়ের দাম বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০-৩৫ শতাংশ। তারপরেও ভারতে পর্যটকদের আগমনে প্রতিকূল বা নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের চাপ বেড়েই চলেছে। এতো গেলো ভারতের কথা। পর্যটনের আরেক অমিত সম্ভাবনার দেশ হলো তুরস্ক। ইউরোপের মনোরম এই দেশটিতে গত বছর তিন কোটি ৫০ লাখ পর্যটক গিয়েছিল। বিশ্বের ষষ্ঠ জনপ্রিয় পর্যটনের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তুরস্ক। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আফ্রিকার প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে পর্যটনে বিনিয়োগ। আফ্রিকার পর্যটন খাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। পর্যটনে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, ও মুনাফার বিচারে এ অঞ্চলটি এখন বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। বিকাশমান পর্যটন শিল্প এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বাড়াতে সহায়তা করছে। ‘ট্যুরিজম ইন আফ্রিকাঃ হারনেসিং ট্যুরিজম ফর গ্রোথ অ্যান্ড ইমপ্রুভড লাইভলিহুড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকা মহাদেশে ২০১১ সালের মধ্যে কেবলমাত্র পর্যটন খাতেই কর্মসংস্থান হবে ৬৭ লক্ষ মানুষের। ২০১১ সালে আফ্রিকার সাব সাহারা অঞ্চলের প্রতি ২০টি চাকরির মধ্যে একটি কোনো না কোনোভাবে পর্যটন সংশ্লিষ্ট। এ দিকে ২০১২ সালে আফ্রিকা ৩ কোটি ৩৮ লক্ষ পর্যটক আকর্ষণ করেছে। আয় করেছে ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা আঞ্চলিক জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৭ লাখ। ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আফ্রিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যার সমাধান সহজ করতে পারে পর্যটন। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, সামাজিক সূচকগুলোর অগ্রগতি, সর্বোপরি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সব কিছুর জন্যই সহায়ক হবে পর্যটন উন্নয়ন। বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্প যখন চমত্কার গতিতে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে তখন আমাদের বাংলাদেশে দারুণ সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পে চরম বিপর্যয় সবাইকে হতাশ করে তুলেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দেশে যখন পর্যটনের মৌসুম শুরু হয়েছে ঠিক সেই সময়ে চলছে অব্যাহত রাজনৈতিক সংকট। ফলশ্রুতিতে দেশব্যাপী অব্যাহত হরতাল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, হামলা পাল্টা হামলা, গাড়ি ভাংচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটছে। যা সবার মধ্যে চরম আতংক। অনিশ্চয়তা, ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় কেউ কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন না। কিছুদিন আগে ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিখ্যাত রাস মেলা উত্সব। প্রতিবছর রাস মেলা উত্সবের সময় সুন্দরবন অঞ্চলে প্রচুর বিদেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে। কিন্তু এবার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে রাস মেলা উত্সবে পর্যটকদের উপস্থিতি মোটেও চোখে পড়েনি। বিদেশি পর্যটকরা সাধারণত ছয় মাস থেকে এক বছর আগেই ভ্রমণ পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামাজিক অস্থিরতার খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় আগামী এক বছরেও এখানে বিদেশি পর্যটকরা বেড়াতে আসবেন না সহজেই ধারণা করা যায়। বাংলাদেশের পর্যটন খাতে মন্দাভাব গত কয়েকবছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ কর্মসূচির কারণে পর্যটন ব্যবসায় ক্রমাগত ধস নেমেছে। গত কয়েক বছরে ক্রমাগত লোকসানের ধাক্কা সামলাতে না পেরে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে এনেছেন। ফলে পর্যটন খাতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত প্রচুর মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত বক্সবাজারে প্রায় ২০০ হোটেল, মোটেল এবং গেস্টহাউজ রয়েছে যেখানে প্রায় ৪০,০০০ পর্যটক থাকতে পারেন। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এবারের পর্যটন মৌসুমের এক মাস সময় অতিক্রম করলেও হোটেল-মোটেলগুলো পর্যটক শূন্য অবস্থায় রয়েছে। হোটেল ভাড়া কমানো হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক পর্যটকের অভাব রয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে পর্যটন শিল্প। সার্ক ও আসিয়ানভুক্ত বহু দেশ বছরে এ খাত থেকে হাজার কোটি ডলারেরও বেশি আয় করে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদের লীলাভূমি এবং পর্যটন শিল্পের এক অপার সম্ভাবনাময় দেশ। এদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অপরিমেয় সৌন্দর্য। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশ প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদে ভরপুর। এ জন্য যুগ যুগ ধরে বিদেশি পর্যটকদের কাছে চিরসবুজ বাংলাদেশ এক স্বপ্নের দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখানে পর্যটক আকর্ষণের জন্য রয়েছে বহু প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, কুমিল্লার কোটবাড়ি ময়নামতির প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত রাঙ্গামাটি, কাপ্তাই, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, প্রভৃতি। তাই প্রাচীনকাল থেকেই এদেশ ইবনেবতুতার মতো বিশ্ববিখ্যাত পর্যটকরা এসেছেন এবং এখানকার প্রাকৃতি রূপ শোভা ও মাধুর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের পর ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও নানা কারণে এ শিল্প অন্যান্য দেশের মতো প্রসার লাভ করতে পারেনি। বাংলাদেশের মোট জিডিপির ২ শতাংশ অবদান পর্যটন খাতের। ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের পর্যটন শিল্পে যে বিপর্যয় নেমে আসছে তার প্রভাবে যারা এখন পর্যটন ব্যবসায় উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাদের পক্ষে প্রচণ্ড ধাক্কা সামলে ওঠা বেশ কঠিন হবে। এমনিতেই নানা কারণে এখানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা নানা অজুহাতে কেবলই পিছিয়ে যাচ্ছে। পর্যটন খাতে ভরাডুবি অবস্থা উদ্যোক্তাদের নিরুত্সাহিত করবেই শুধু। ফলে পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ আগের চেয়ে কমে যাবে। কিছুদিন আগে দেশের পর্যটন শিল্পের আর্থিক কর্মকাণ্ডের হিসাব বের করতে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট একাউন্ট বা টিএসএ তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতিবছর কতজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসে, তারা কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, হোটেল, মোটেল, যানবাহন ও অন্যান্য সেবা খাতে কী পরিমাণ আয় হয়— এসব তথ্য সংগ্রহের জন্য জরিপ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। এর মাধ্যমে দেশের পর্যটন খাত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে, যা উদ্যোক্তাদের অনেক কাজে আসবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের পর্যটন খাত সম্পর্কে স্পস্ট ধারণা পাবেন। জিডিপিতে এ খাতের অবদান কত তাও জানা যাবে। পর্যটন খাতের আন্তর্জাতিক মান, ধারণা ও সজ্ঞা অনুযায়ী পণ্য ও সেবার মূল্যায়ন করার প্রয়োজন যা টিএসএর মাধ্যমে করা হয়। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ টিএসএ তৈরি করলেও বাংলাদেশে গত চারদশকেও এর জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এক গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ৮০টি খাত সরাসরি এবং অপ্রত্যক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অব্যবস্থার কারণে পর্যটন শিল্প বিপর্যস্ত হয় তখন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ৮০টি খাতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার জরিপে জানা যায়, গত ২০২২ সালে বাংলাদেশের ১২৮১,৫০০ জনক মানুষ সরাসরি পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এটা দেশের মোট কর্মে নিয়োজিত জনশক্তির শতকরা ১ দশমিক ৮ ভাগ। দেশের ২৭,১৪,৫০০ জন মানুষ অপ্রত্যক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ঐ সময়ে। আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ৩৮,৯১,০০০ এ পৌঁছুবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তখন দেশের মোট কর্মে নিয়োজিত জনশক্তির শতকরা চার দশমিক ৩ ভাগ পর্যটন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন প্রত্যক্ষভাবে। পর্যটন খাতে ২০১২ সালে মোট বিনিয়োগ হয়েছিল ১৯,০০০ কোটি টাকা। চলতি ২০১৩ সালে জিডিপিতে ২.১ থেকে পর্যটন খাতের অবদান বৃদ্ধি পেয়ে ৭.৭ এ পৌঁছার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও তা অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়। পর্যটন শিল্পে লোকসান এবং বেকারত্ব সুস্পষ্ট হওয়ায় এক ধরনের হতাশা ক্রমেই গ্রাস করেছে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীদের। এখন বাংলাদেশে পর্যটনের পিক সিজন’ চলছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের পর্যটন শিল্পে চলছে এক চর স্থবির অবস্থা। যেখানে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তরা মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতেন এখন সেখানে তারা লোকসানের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হওয়ায় এখানে বেড়াতে এসে কেউ বিপদে পড়তে চাইবে না— এটাই স্বাভাবিক। তাই এখানে ভ্রমণ নিরাপদ, নিশ্চিত, আশংকামুক্ত করতে হবে যে কোনো মূল্যে। এটা করা উচিত আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য।