দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হইবে। এই জন্য চালু করা হইবে কার্ড পদ্ধতি। সমপ্রতি এই তথ্য প্রকাশ করিয়াছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বিষয়টি উত্সাহব্যাঞ্জক নিঃসন্দেহে। তাহার পরও কেউ কেউ বলেন, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার পরিকাঠামো আমাদের দেশে বিদ্যমান রহিয়াছে আগে হইতেই। সরকারি সকল হাসপাতালেই নামমাত্র মূল্যে টিকিট কিনিয়া যে কেহ সেবা গ্রহণ করিতে পারেন। আপাত বিবেচনায় কথাটি অসত্য নহে। বাস্তবিকপক্ষেই বাংলাদেশের গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পরিকাঠামো। দেশের প্রায় সবকয়টি উপজেলায় রহিয়াছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল। ইউনিয়ন পর্যায়ে আছে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। ওয়ার্ড পর্যায়ে থাকিবার কথা কমিউনিটি হাসপাতাল। সকল ওয়ার্ডে এখনও পর্যন্ত কমিউনিটি হাসপাতাল চালু করা সম্ভবপর না হইলেও অধিকাংশ ওয়ার্ডেই উহা আছে। ইহাছাড়াও উপজেলা সদরের বাহিরে আছে একাধিক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। এইসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যিনি বা যাহারা চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিতে যান, তাহাদের বিনামূল্যেই সেবা পাইবার কথা। যত্সামান্য সেবা তাহারা পাইয়াও থাকেন বটে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগিদেরও কোনো ব্যয় করিতে হয় না। অন্তত কাগজপত্রে ইহাই নিয়ম।
সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও অন্যান্য সরকারি হাসপাতলে সাধারণ ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বেডই ফ্রি। আর কিছুসংখ্যক বেড সংরক্ষিত রহিয়াছে, যেইগুলি পেয়িং। সামর্থ্যবানরা সাধারণত পেয়িং বেডে ভর্তি হইয়া থাকেন। এইসব হাসপাতালে রোগির ঔষধ ও খাবার দেওয়ার কথা হাসপাতাল হইতে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি কী তাহা কমবেশি সকলেরই জানা। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাসমূহও হাসপাতালের নিজস্ব ল্যাবে কমমূল্যে হওয়ার ব্যবস্থা আছে। এই সবই কাগুঁজে। আদতে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে কিংবা সাশ্রয়ীদামে কিরূপ সেবা পাওয়া যায় তাহা কাহারও অজানা নহে। অন্যদিকে গ্রাম মফস্বলের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহে যেইখানে চিকিত্সকই থাকেন না, সেইখানে বিনামূল্যে কিংবা দাম দিয়া সেবা পাইবার প্রশ্নটিই তো অবান্তর।
চিকিত্সকগণের যাহাদের মফস্বলে পোস্টিং দেওয়া হয় তাহাদের কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকিবার প্রবণতাদৃষ্টে সরকার নিজেই বিব্রত। এই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন। শাস্তি দেওয়া হইবে বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনা হইয়াছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী কর্মস্থলে চিকিত্সকদের উপস্থিত থাকিবার জন্য বলিয়া যাইতেছেন পূর্বাপর। অনুপস্থিত চিকিত্সকদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গৃহীত হইয়াছে। গত তিনমাসে এই অভিযোগে আঠার জন চিকিত্সককে বরখাস্ত করা হইয়াছে বলিয়া পত্রিকায় রিপোর্ট হইয়াছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো ইতরবিশেষ ঘটিয়াছে, তেমনটি ভাবিবার অবকাশ আছে বলিয়া মনে হয় না।
এই যখন বাস্তবতা, তখন দরিদ্রশ্রেণীর জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিবার ঘোষণা খানিকটা কৌতুককর বলিয়া মনে হওয়া অসম্ভব নহে। তবে দরিদ্রদের আলাদা করিয়া সেবা পাওয়ার জন্য কার্ড দেওয়া হইলে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে বলিয়াই আশা করা যায়। সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিবার সামর্থ্য সরকারের নাই। তেমনটি কেহ আশাও করেন না। কিন্তু গ্রাম ও শহরের হতদরিদ্রশ্রেণী, যাহাদের পক্ষে রোগে শোকে টাকা দিয়া চিকিত্সা ও ঔষধ কেনা সম্ভব নহে, তাহাদের বিষয়টি অবশ্যই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কার্ড পদ্ধতি চালু করা হইলে এই ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনয়নের পাশাপাশি সেবার মানোন্নয়নও হইবে। তবে স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান দায়িত্বহীনতা এবং অনিয়মের অবসান ঘটান না গেলে ভাল পদক্ষেপ নিয়াও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাইবে না। কাজেই সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিয়ম-শৃৃঙ্খলা সুনিশ্চিত করা। মনে রাখিতে হইবে চিকিত্সা পাওয়া কোনো অনুগ্রহের বিষয় নহে। ইহা নাগরিকগণের মৌলিক অধিকার।
