ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৪, ২১:২০
আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, কিছু অসংগতি থাকা সত্ত্বেও ভারত রাষ্ট্রের সম্ভাবনা ব্যাপক। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক ভারতের ভিত্তিমূল সমন্বিত মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব। আইনি প্রক্রিয়া ও সমতার নীতি অবলম্বনে তা ফলপ্রসূ হচ্ছে। প্রাচীন ভারতের ভিত্তিমূল ছিল পৌরাণিক কাহিনীসমূহ ও ধর্মতত্ত্ব। যদিও আধুনিক ভারতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অতীন্দ্রিয়বাদ এবং মহাত্মা গান্ধীর আধ্যাত্মিক চেতনা ও নৈতিক প্রভাব বিদ্যমান, তথাপি ভারত আসলে একটি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর আইনগত ভিত্তি দাঁড় করিয়ে গেছেন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা-জনক আম্বেদকার, নেহরু ও প্যাটেল। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় এই লক্ষ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। সেই অনুযায়ী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল, ন্যায়বিচার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, সাম্য ও সমধর্মিতা বা সৌভ্রাত্র। সংবিধান অনুযায়ী আইনের চোখে সকলেই সমান। এই আইনই আধুনিক ভারতের ভিত্তি রচনা করেছে। গত ৬৩ বছরে ভারতীয় জনসংখ্যা ৩৭ কোটি থেকে ১২০ কোটিতে উপনীত হয়েছে। এই সুদীর্ঘ পথচলায় ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামো আভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের চাপ মোকাবিলা করে কিভাবে সুসংগঠিত হল? কিভাবে গণতান্ত্রিক ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখা সম্ভব হল? আমার রচিত বইগুলোতে আমি এই প্রশ্নের জওয়াব দেয়ার চেষ্টা করেছি। হাজার হাজার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এ কথা সকলেই স্বীকার করবেন যে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, শুধু তাই নয়, পৃথিবীর বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্রের কারণেই বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে টিকে আছেন। বিশেষ করে ভারতের গ্রামাঞ্চলে সামাজিক দমন-পীড়ন ও বর্ণ আধিপত্য বেশি। কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্র অত্যাচারিত ও দুর্বলের মুক্তির পথ বাতলিয়ে দিয়েছে। তারা নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নেতৃত্ব বদলের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ পাচ্ছেন। ইউপিএ সরকার গ্রামীণ এলাকায় গরীব ও অসহায় লোকদের জীবন মানোন্নয়নে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এভাবে রাষ্ট্র ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ঘটছে মেলবন্ধন। আজ যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ভারতের জাতি গঠনের উপায় কি? যে দেশে রাজনৈতিক পরিচিতির ভিত্তিতে সবকিছু বিবেচনা করা হয়, সেখানে বিশেষত সাধারণ নির্বাচনের সময় আমি তাদের উদ্দেশ্যে বরং পাল্টা প্রশ্ন রাখতে পারি। তাহলো- একজন ভারতীয় নাগরিকের আসল পরিচয় কী? ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ মধ্যভাগে যখন ইতালি জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হল, তখন একজন ইতালিয়ান জাতীয়তাবাদী লিখেছিলেন, ‘ আমরা ইতালি সৃষ্টি করেছি। এখন আমাদের সকলের দরকার ইতালিয়ান সৃষ্টি করা।’ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পরও কোন ভারতীয় জাতীয়তাবাদীকে এমন আক্ষেপ করতে হয়নি। আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা নেহেরু কখনই ভারতীয় নাগরিক তৈরি করার কথা বলেননি। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, বিংশ শতাব্দীতে স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভারত ও ভারতীয় নাগরিকত্ব্বের ধারণা আবহমান কাল থেকেই বিদ্যমান। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কোন প্রথাগত জাতীয় পরিচিতির ওপর টিকে নেই। ভাষা, নৃগোষ্ঠী, ধর্ম, ভৌগলিক অবস্থান বা নির্দিষ্ট কোন ভূ-খন্ড এর প্রতিবন্ধক নয়। ভারতবর্ষ ধারণারই উদ্ভব হয়েছে একটি প্রাচীন সভ্যতার ভিত্তিতে যাদের রয়েছে একই ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এই ইতিহাস-ঐতিহ্য বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের কারণেই টিকে আছে। তাই ভারতীয় গণতন্ত্রে কোন সংকীর্ণতা নেই। নাগরিকদের ওপর জোর করে কোন কিছু চাপিয়েও দেয়া হয়নি। যার অন্যতম প্রমাণ হল ভারতের রাষ্ট্রভাষার সংখ্যা ২৩টি। ভারতীয় বহুত্ববাদের সুবিধা হল একইসঙ্গে একাধিক পরিচিতি ধারণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে একজন ভাল মুসলিম, বাঙালি ও ভাল ভারতীয় হওয়া যায়। যে কোন কিছুর বিনিময়ে আমাদের এই বহুত্ববাদ রক্ষা করতে হবে। এটাই গণতন্ত্রের আত্মা বা প্রাণশক্তি। আর কিছুদিন পরই ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এমন শক্তিও মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেছে যারা এই আইডিয়া অব ইন্ডিয়া বা ভারতবর্ষ ধারণার সাথেই একমত নন। তারা সংকীর্ণ সামপ্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট। যারা বৈচিত্র্য ও ভিন্নতার প্রতি অসহিষ্ণু। কে ক্ষমতায় আসছে তা বড় কথা নয়। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যাতে শেষপর্যন্ত ভারতবর্ষের উপরোক্ত আদর্শের অনুসারীরাই বিজয়ী হন। সংক্ষেপিত ও এনডিটিভির সৌজন্যে ইংরেজি থেকে ভাষান্তর ফাইজুল ইসলাম লেখক : কেন্দ্রীয় ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী। তাঁর সামপ্রতিক প্রকাশিত গ্রন্থ- প্যাক্স ইন্ডিয়া : ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড অব দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন