ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। স্বাদে গন্ধে ইলিশ আমাদের এক অতুলনীয় মত্স্য সম্পদ। দেশের মোট মত্স্য উত্পাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১২%। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১%। বিশ্বের মোট ইলিশ উত্পাদনের শতকরা ৫০-৬০ ভাগই বাংলাদেশে উত্পাদিত হয়, অবশিষ্ট ২০-২৫% মিয়ানমারে, ১৫-২০% ভারতে এবং ৫-১০% অন্যান্য দেশে। ইলিশ আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় সম্পদ এবং ঐতিহ্যের অংশ।
ইলিশের পোনাকে (৯ ইঞ্চি/২৩ সেন্টিমিটার এর নীচে) জাটকা বলা হয়। জাটকা নির্বিচারে ধরা হলে ইলিশের উত্পাদন কমে যায়। তাই ইলিশ উত্পাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখতে জাটকা সংরক্ষণ করা অপরিহার্য।
ইলিশ মাছ সাগরে বড় হয়। ডিম ছাড়ার জন্য এরা মোহনা ও নদ-নদীতে অভিপ্রায়ন করে। ইলিশ মাছ ১-২ বছর বয়সেই প্রজননক্ষম হয়। পুরুষ ইলিশ ২২-২৫ সে.মি. আকারে এবং স্ত্রী ইলিশ ২৮-৩০ সে.মি. আকারে পরিপক্বতা লাভ করে। ইলিশ মাছ সারা বছরই কমবেশী ডিম দেয়; তবে অক্টোবর মাসই হচ্ছে ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। এ সময় শতকরা ৬০-৭০ ভাগ ইলিশ পরিপক্ব হয় এবং ডিম ছাড়ার উপযোগী অবস্থায় থাকে। তাই অক্টোবর মাসের (আশ্বিন/কার্তিক) বড় পূর্ণিমার দিনসহ পূর্বের ৫ দিন ও পরের ৫ দিন অর্থাত্ মোট ১১ দিন প্রজনন এলাকায় ইলিশ মাছ ধরা সরকার কর্তৃক আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইলিশের ডিম পরস্ফুিটনের মাধ্যমে ইলিশের বাচ্চা “জাটকা” তৈরি হয়। জাটকা নদ-নদীতে বিচরণ করে। তখন জেলেরা নির্বিচারে জাটকা আহরণ করতে চায়। নির্বিচারে জাটকা ধরা হলে ইলিশ উত্পাদন ও আহরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেননা জাটকা মাছ ইলিশ মাছের নতুন প্রজন্মের প্রবেশন স্তর। তাই জাটকা সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে দেশের ৫টি নদ-নদীকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে নিম্ন মেঘনা নদী, শাহবাজপুর চ্যানেল, তেঁতুলিয়া নদী, আন্দারমানিক নদী এবং নিম্ন পদ্মা। জাটকার এসব প্রধান বিচরণ ক্ষেত্রে প্রতি বছর নভেম্বর হতে মে পর্যন্ত জাটকা আহরণ নিষিদ্ধ হলেও মার্চ -এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ পরিমাণে (৬০-৭০%) জাটকা ধরা পড়ে। তাই নভেম্বর হতে মে মাস পর্যন্ত অভয়াশ্রম ঘোষণার প্রয়োজন হলেও জেলেদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করে একমাত্র আন্দারমানিক নদী ছাড়া অন্যান্য অভয়াশ্রমে মার্চ ও এপ্রিল মাসে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আন্দারমানিক নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ সময় নভেম্বর-জানুয়ারী। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১১ দিন ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ২৭ হাজার কোটি জাটকা ২০১৩ সালে ইলিশ জনতায় নতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে। ইলিশ সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে এ ধারা প্রতি বছর অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আগামী ১৮-২৪ মার্চ দেশে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এ বছর জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “জাটকা মাছ রক্ষা পেলে, বারো মাস ইলিশ মেলে”। প্রতিপাদ্য বিষয়ের সাথে সুর মিলিয়ে জাটকা সুরক্ষায় আমাদের সকলের এগিয়ে আসা উচিত। জাটকা ধরা, মজুত, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও খাওয়া থেকে আমাদের বিরত থাকা দরকার। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ।
ইলিশ/জাটকার উন্নত ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের ফলে বিগত কয়েক বছর ইলিশের উত্পাদন ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর ১০-১২ হাজার মে: টন করে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০১২-২০১৩ অর্থ বছর ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লক্ষ ৫১ হাজার মে. টনে উন্নীত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হলে আগামী ৫ বত্সরে ইলিশের উত্পাদন ৪.০ লক্ষ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে -যার বাজার মূল্য ১৬,০০০ হাজার কোটি টাকা। সে লক্ষ্যে প্রজননক্ষম ইলিশ রক্ষায় বর্তমানে ১১ দিন নিষিদ্ধকালীন সময় ঠিক রেখে ইলিশের প্রজনন হার ৫০% এর অধিক কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। অপরদিকে, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ সম্পদ রক্ষার জন্য জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভিজিএফ কর্মসূচীর ব্যাপ্তি পূর্বের ১০টি জেলা থেকে বাড়িয়ে ১৬টিতে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। নতুন জেলাসমূহ হলো- নোয়াখালী, বাগেরহাট, মানিকগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম ও মাদারীপুর। এর ফলে ২০১২-১৩ অর্থ বছরে ভিজিএফ আওতাভুক্ত ১৬টি জেলার ৮৮টি উপজেলায় মোট ২,০৬,২২৯টি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভিজিএফ চাল ১০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ইতোমধ্যে পরিবার প্রতি মাসিক ৩০ কেজি হারে প্রদান করা হচ্ছে। জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ভিজিএফ প্রদানের ফলে তাদের অন্নের সংস্থান সুনিশ্চিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে জেলেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে জাটকা আহরণ থেকে বিরত থাকছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ইলিশ মাছে আছে উচ্চ মাত্রায় আমিষ, চর্বি ও খনিজ পদার্থ। ইলিশ মাছের আমিষে ৯ ধরনের অ্যামাইনো এসিড পাওয়া যায়-যা মানুষের পাকস্থলী উত্পাদন করতে পারে না। ইলিশ মাছের চর্বিতে প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে। উক্ত অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের প্রায় ২% ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, যা মানব দেহের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করে হূদরোগের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া, ইলিশ মাছ খেলে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ইত্যাদি মারাত্মক রোগ থেকে নিজেকে সুরক্ষা করা যায়।
লেখক : মত্স্য গবেষক
