এই সমাজের অংশ তাহারাও

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৪, ২২:১৭
বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৯ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। এই হিসাব ২০১০ সালের। গত তিন বত্সরে জনসংখ্যা যে আরও বাড়িয়াছে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। বোধগম্য কারণেই বৃদ্ধি পাইয়াছে প্রতিবন্ধী লোকের সংখ্যাও। এক্ষণে দেশে আনুমানিক ১ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতিবন্ধিতার শিকার। এইকালে বিশ্বব্যাপী প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যমাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। আমাদের দেশেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এইসব মানুষের জন্য অনেকেই কাজ করিতেছেন। সরকারেরও বিশেষ মনোযোগ আছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভর্তি হইবার পথে কোনো বাধা নাই, বরং বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা সেই সুবিধা কতখানি ভোগ করিতে পারিতেছেন, সেই প্রশ্ন রহিয়াই গিয়াছে। সত্যিকারার্থে আমাদের সমাজ এখনও পর্যন্ত যথার্থ প্রতিবন্ধীবান্ধব হইয়া উঠিতে পারে নাই। দৈহিক, মানসিক, বাক, শ্রবণ কিংবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নাগরিকদের ব্যাপারে মুখে এবং কাগজেকলমে সহানুভূতি প্রদর্শন আর কার্যক্ষেত্রে তাহাদের সুবিধা-অসুবিধা অনুযায়ী অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করিবার মধ্যে ব্যবধান আছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, প্রতিবন্ধী ভোটারগণের অনেকেই তাহাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করিতে পারেন না। যাহারা শারীরিক প্রতিবন্ধী তাহাদের অনেকের পক্ষেই হাঁটিয়া ভোট কেন্দ্রের বুথে যাওয়া সম্ভবপর হয় না। ভোটকেন্দ্র যদি দোতলা তিনতলা হয় তাহা হইলে তো ভোট দিতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। কেবল ভোট দেওয়ার ব্যাপার বলিয়া কথা নহে, বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ভবনই শারীরিক প্রতিবন্ধীদের প্রবেশ করিবার জন্য অনুকূল নহে। এমন কি রেল স্টেশন, লঞ্চঘাটে প্রবেশ এবং ট্রেনে লঞ্চে প্রতিবন্ধীগণ যাহাতে সহজেই উঠিতে পারেন সেই ব্যবস্থাও নাই। অথচ উন্নত বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই প্রতিটি ভবনে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সহজে প্রবেশ করিবার জন্য পৃথক র্যাম্প (বিশেষ ধরনের সিঁড়ি) থাকে। আমাদের দেশে তাহা তো নাই-ই, প্রতিবন্ধীদের সাহায্য করিবার জন্যও লোক পাওয়া যায় না। বাসে প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন নির্দিষ্ট থাকিলেও অনেক সময়ই তাহা সাধারণযাত্রীরা দখল করিয়া রাখেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাগজেপত্রে প্রতিবন্ধীদের ভর্তি হইতে বাধা না থাকিলেও তাহাদের বিশেষ চাহিদাগুলি অপূর্ণ থাকিয়া যায়। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর লেখাপড়ার জন্য বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাহা নাই। প্রতিবন্ধীদের পাঠদানের জন্যও প্রয়োজন বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরসমূহে বেসরকারি উদ্যোগে বাক-শ্রবণ, মানসিক ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ধরনের স্কুল পরিচালিত হইলেও প্রতিবন্ধীদের বৃহত্তর অংশ সেই সুবিধা পান না। অন্যদিকে সামাজিক ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রীতিপ্রদ নহে অনেক ক্ষেত্রে। তাহারাও মানুষ, কাহারও না কাহারও ভাই, বোন অথবা সন্তান, তাহাদেরও যে রহিয়াছে আনন্দ বেদনা, স্বপ্ন ও সাধ, সেই কথা আমরা ভুলিয়া যাই প্রায়শ। প্রতিবন্ধিতা কোনো অপরাধ নয়। প্রতিবন্ধী হইয়া জন্ম নেওয়া কিংবা জন্মের পরে কোনো দুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধিতার শিকার হওয়ার জন্য তাহারা দায়ী নহে। তাহারা সমাজেরই অংশ। সামান্য আনুকূল্য ও যত্ন পাইলে সমাজকে তাহারাও দিতে পারেন অনেক কিছু। বিশ্বের ইতিহাসে এমন অনেক মহান মানুষের নাম লেখা রহিয়াছে, যাহারা প্রতিবন্ধী হইয়াও রাখিয়া গিয়াছেন অনন্যসাধারণ অবদান। কাজেই প্রতিবন্ধী নাগরিকদের প্রতি নিজ নিজ অবস্থান হইতে সকলেরই মনোযোগী ও যত্নশীল হওয়া একান্ত কর্তব্য।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন