মনে পড়ে খেলার মাঠে মজা করছিলাম বলে ফুটবল রেফারির কাছে একবার বকা খেয়েছিলাম—সেটা মনে থাকার কারণ কিন্তু ‘বকা’টি নয়, কারণ ছিল ‘বকার ভাষা’। তিনি বলেছিলেন, “মনে রেখো, খেলাটা একটা খেলা নয়, খেলা একটা সাধনা”। সেই নিবেদিতপ্রাণ রেফারির কথাটি আমি জীবনের সব কর্মকাণ্ডে মনে রাখি। যে কাজই করি না কেন আমি আমার অবচেতনে কাজটা ভালোভাবে. যত্ন করে কাজটার প্রতি মর্যাদা সহকারে পালন করতে চেষ্টা করতাম। এর ফলেই হয়তো কোনো কাজে ব্যর্থ হলেও আমি নিজেকে বলি, ‘যথাযথ চেষ্টা তো করেছি’। আমার এই শিশুতোষ মনোভাব অবশ্য ব্যক্তিপর্যায়ে প্রযোজ্য হলেও দলীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করা কঠিন, যদি না দলের প্রতিটি সদস্য একই দর্শনে অনুপ্রাণিত না হয়ে থাকেন। বাংলাদেশে ‘বিশ্ব টি- টোয়েন্টি’ ক্রিকেট এখন সমাপ্তপ্রায়। এই সময়ে খেলা শব্দটি সেদিকে দিক নির্দেশ করে, তবে আমি মনে করি আমার মনে খেলা যে একটা সাধনা এই ধারণা আমাদের ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মনে রাখা প্রয়োজন। এটা মনে রাখলে আমরা অনেক অবাস্তব প্রত্যাশা থেকে বিরত হতাম। রাষ্ট্র পরিচালনা অবশ্যই খেলা নয়, কিন্তু খেলার ক্ষেত্রে যে নিবেদিতপ্রাণের প্রয়োজন, যতটা অনুরক্তি থাকা কাঙ্ক্ষিত সে সব রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না কি? খেলার কথায় ফিরে আসি। আমি মনে করি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল খুবই পরিপক্ব ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠেছে। এটা আমি স্তোকবাক্য বা আত্মতুষ্টির জন্য বলছি না। বলছি এই জন্য যে প্রতিটি খেলোয়াড় এই কয়েকটি ইনিংসে খুবই নৈপুণ্যতা ও খেলার প্রতি মর্যাদা দেখিয়েছেন। শেষে তারা হেরেছেন ঠিকই, কিন্তু কোনোটাতেই তারা খেলোয়াড়সুলভতার বাইরে পা দেননি। ভুলভ্রান্তি হয়েছে ঠিকই, দল সদস্য বাছাই, কখন কাকে বল করতে দেয়া হবে (যেমন, অনেক উচ্চ ধাপে থাকা দল পীচ বিচার করে প্রথমেই স্পিনার দিয়ে বোলিং ওপেন করে, আর বাংলাদেশ একজন মিডল পেসারকে প্রথম থেকে চারটি ওভার দিতে ডাকে), ফিফটি ওভারের ও টেস্টের ব্যাটিং অর্ডার টি- টোয়েন্টিতে রাখাটা যথাযথ নয়, ফিল্ডিং ব্যবস্থা বোলার অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয় না, অপরপক্ষের ব্যাটসম্যানদের যাচাই করে বোলার ও ফিল্ডিং পরিবর্তন করা হয়নি, ইত্যাদি। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘ক্রিকেট’ নামের অতি উচ্চমানের একটা খেলার জনপ্রিয় সংস্করণ ‘ফিফটি ওভার’ বা ‘টি-টোয়েন্টি’ একটা উন্মাদনা সৃষ্টিকারী ও অর্থকরী খেলা হতে পারে মাত্র। ফলে প্রতি ওভারে গড়পড়তা দশ রান করার টার্গেট নিয়ে ব্যাটিং করা আর বিপক্ষ দলকে ওভার প্রতি পাঁচ রানে সীমাবদ্ধ রাখার খেলাকে ‘ছেলেমানুষি’ ছাড়া আর কী বলা যায়? তারপরেও বাংলাদেশ দল এই খেলাকেও সাধনা মনে করে খেলেছে, এবং ব্যাটিং বোলিং ফিল্ডিং আচরণ—সবেতেই নৈপুণ্য দেখিয়েছে।
এবার একই বক্তব্য যদি আমাদের রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে নিয়ে আসি, তবে আমরা কী দেখবো? মনোনয়ন পাওয়ার খেলা থেকে নির্বাচিত হওয়া এবং তার পরে সাংসদ হয়ে থাকার খেলায় আমাদের জনপ্রতিনিধিরা কী করছে? আরো একটা খেলা আছে, সেটা হলো ভবিষ্যতের নির্বাচনের অনুশীলন করা। টি-টোয়েন্টিতে যেমন জেতাটাই ভ্রান্তভাবে বড় করে দেখা হয়, রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতেও তাই। গ্যালারির দর্শক বা টেলিভিশনের দর্শক এই দুই খেলাতেই নিজ দলের দমাদম বাউন্ডারি, আর অন্য দলের পটাপট উইকেট পতন ছাড়া আর কিছু উপভোগ করেন বলে মনে হয় না—তারা খেলার নৈপুণ্য উপভোগ করেন কি?
দর্শকদের এই প্রত্যাশা থেকে দুটো খেলাই ‘খেলা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘সাধনার বস্তু’ হওয়া থেকে সরে গেছে। সেখানেই সমস্যা—টি-টোয়েন্টির এবং রাজনৈতিক খেলার মাঠে। দর্শকদের আনন্দবর্ধনের প্রচেষ্টা অবশ্যই করা উচিত, কিন্তু দুটোতেই সেটা করতে হবে মূল উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করে। টি-টোয়েন্টি বা যে কোনো মাঠের বা ঘরের খেলায় নৈপুণ্য অর্জন ও প্রদর্শন যেমন উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, রাজনীতির খেলাতেও তেমনি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যথাযথভাবে কাজ করতে হয়।
টি-টোয়েন্টি সাঙ্গ হচ্ছে। আবার এক বছর অপেক্ষা, এই এক বছরে খেলাটিকে খেলোয়াড় ও দর্শকের কাছে একটা ‘সাধনা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তুতি নেয়া যায়। অপরপক্ষে রাজনীতি সর্বদা চলমান, নিরবচ্ছিন্ন এর গতি। এখানে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং ও আচরণে ভুলভ্রান্তি হলে সেটা তাত্ক্ষণিকভাবে শুধরাতে হবে—এই খেলা সাঙ্গ হবে না কখনোই। সুতরাং রাজনীতিবিদদের অধিক সাবধানী হতে হবে, প্রথম থেকেই স্বীয় কর্মকাণ্ড যে ‘সাধনা’ তা মনে রাখতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতি গবেষক
