জার্গুসেন অধ্যায়ের সমাপ্তি!

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৪, ২২:০১
দেখা হলে নিজে থেকেই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, সবসময় মুখে এক চিলতে হাসি লেগে আছে, কথাবার্তায় বিনয় ঝরে ঝরে পড়ছে; এমন একজন মানুষকে কী অপছন্দ করা যায়! মানুষ শেন জার্গুনসেনকে যারা দুই-একবারও দেখেছেন, তারা অন্তত এই অস্ট্রেলিয়ানের নিন্দা করতে পারবেন না। অজাতশত্রু ভাবমূর্তির জার্গুনসেনের বাংলাদেশ পর্ব শুরুও হয়েছিল লাখো মানুষকে ‘বন্ধু’ বানিয়ে। বোলিং কোচ থেকে ভারপ্রাপ্ত কোচ, তারপর প্রধান কোচ; দায়িত্বের ঊষালগ্নেই একটার পর একটা সাফল্য এনে দিয়ে সকলকে আপনও করে নিয়েছিলেন; কিন্তু সেই সাফল্যও দূরে সরে গেলো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে শেষও হয়ে গেলো বাংলাদেশের জার্গুনসেন অধ্যায়। গুঞ্জন বা ফিসফাস আকারে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) তরফেই। ২০১৪ সালের শুরু থেকে একটার পর একটা বিপর্যয়ের রেশ ধরে সদ্য সমাপ্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলা অবস্থাতেই বিসিবি সভাপতি বলেছিলেন, দলে অনেক পরিবর্তন আনতে চান। এরপর বোর্ডের উচ্চপদস্থ সূত্র বলেছিল, তারা নতুন কোচ খোঁজা শুরু করেছেন। তার মানে, জার্গুনসেনকে ছাঁটাই করা হবে। সে পর্যন্ত বিসিবিকে যেতে দেননি অস্ট্রেলিয়ান এই কোচ। তার আগে গতকাল ই-মেইল যোগে নিজেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। বোর্ডেরও তাকে নিয়ে সংশয়, অন্য দিকে জার্গুনসেনের নিজের পদত্যাগ; দুইয়ে মিলিয়ে বাংলাদেশে এই কোচের অভিযান শেষ বলে ধরে নেয়াটাই স্বাভাবিক; কিন্তু একটু সংশয় রেখে দিয়েছেন কোচ নিজেই। তিনি নাকি তার পদত্যাগ পত্রে বলেছেন, বিসিবি চাইলে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে রাজি। যদিও ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, বিসিবি নিতান্ত বিপাকে না পড়লে এমন কিছু করবে না। তবে পদত্যাগপত্র পাওয়ার খবর নিশ্চিত করে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান বলেছেন, ‘এটা শেন জার্গুনসেনের আবেগী সিদ্ধান্ত বলে মনে হচ্ছে। তার সঙ্গে আলাপ করলে বুঝতে পারবো আমরা।’ আলাপ হোক বা না হোক, বাড়িয়ে হলেও জুন মাসের পর যে আর জার্গুনসেন থাকছেন না; সেটা একরকম নিশ্চিত। ২০১১ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের সাবেক এই বোলিং কোচ বাংলাদেশে যখন প্রথম পা রেখেছিলেন, তখন নিজেও নিজেকে ‘হেড কোচ’ পদে কখনো কল্পনা করেননি; এ কথা শেন জার্গুনসেন অনেকবার বলেছেন। প্রথমে স্টুয়ার্ট ল, পরে রিচার্ড পাইবাসের দলে একেবারে নিরীহ দর্শক, লো প্রোফাইল একজন স্ট্যাফ হিসেবে কাজ করে গেছেন; কিন্তু পাইবাস হঠাত্ চাকরি ছেড়ে দেয়ায় ২০১২ সালের নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজে কাজ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। সেই দায়িত্ব পেয়ে এতোটা চমকে দেন জার্গুনসেন, যে বিসিবি তাকেই রেখে দেয়। প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতাপশালী দলের বিপক্ষে আকর্ষণীয় টেস্ট পারফরম্যান্সের পর প্রবল দাপুটে ওয়ানডে সিরিজ জয়। এরপর শ্রীলঙ্কা সফরের আগে পুরোদস্তুর কোচ করে দেয়া হয় কুইন্সল্যান্ড, তাসমানিয়া ও সাসেক্সের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলা এই সাবেক ফাস্ট বোলারকে। এরপর শ্রীলঙ্কা সফরে ঐতিহাসিক গল টেস্টের পারফরম্যান্স, ওয়ানডে সিরিজে সমতা আনা জয় এবং নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইট ওয়াশ; সাফল্যের পালক কম নয় জার্গুনসেনের। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেখানে একটি টেস্ট হার বাদ দিলে টেস্টে তার আমলেই সেরা সময়টা কাটিয়েছে বাংলাদেশ। ৯ টেস্টে ১টি জয় ও ৪টি ড্র করেছে জার্গুনসেনের দল! কিন্তু এই সবকিছু ম্লান হয়ে গেছে ২০১৪ সালের প্রথমার্ধে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ, এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্সে। এর মধ্যে বিশ্বকাপে হংকংয়ের বিপক্ষে হারটা হজম করতে পারেননি কেউ। ফলে জার্গুনসেনের ইতিহাসটা ভুলে বোর্ড পরিচালকরাই অনেকে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন তার ওপর। আর এই সবকিছু মিলিয়েই শেষ হল আরেকটা পর্ব। বাংলাদেশের বিদেশী কোচরা কোচ দেশ দায়িত্বকাল মুদাসসর নজর পাকিস্তান ১৯৯০ মহিন্দর অমরনাথ ভারত ১৯৯৪ গর্ডন গ্রিনিজ উইন্ডিজ ১৯৯৭-১৯৯৯ এডি বারলো ইংল্যান্ড ১৯৯৯-২০০০ ট্রেভর চ্যাপেল অস্ট্রেলিয়া ২০০১-২০০২ মহসিন কামাল পাকিস্তান ২০০২-২০০৩ ডেভ হোয়াটমোর অস্ট্রেলিয়া ২০০৩-২০০৭ শন উইলিয়ামস অস্ট্রেলিয়া ২০০৭ * জেমি সিডন্স অস্ট্রেলিয়া ২০০৭-২০১১ স্টুয়ার্ট ল অস্ট্রেলিয়া ২০১১-২০১২ রিচার্ড পাইবাস ইংল্যান্ড ২০১২ শেন জার্গুনসেন অস্ট্রেলিয়া ২০১২-২০১৪ * ভারপ্রাপ্ত রেকর্ডে জার্গুনসেন-যুগ ম্যাচ জয় পরাজয় ড্র/পরিত্যক্ত ওয়ানডে ২১ ৮ ১২ ১ টেস্ট ৯ ১ ৪ ৪ টি-টোয়েন্টি ১৪ ৩ ১১ ০ দায় মিডিয়ার! স্পোর্টস রিপোর্টার এই রোগটা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বেশ ভালোমতোই পেয়ে বসেছে, দেখা যাচ্ছে—কিছু একটা হলে মিডিয়ার ওপর দায় চাপিয়ে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করা। ক্রিকেটাররা বলেন, তারা মিডিয়ার চাপে ভালো খেলতে পারেন না। আবার এখন কোচ পদত্যাগ করার কারণও নাকি মিডিয়ার সংবাদ! অন্তত তেমনটাই দাবি করছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তারা। বোর্ডের সভাপতি নিজে প্রকাশ্যে বলেছেন, দলে অনেক পরিবর্তন আনা হবে। এরপর বোর্ডের পরিচালকরা কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, তারা নতুন কোচ খুঁজছেন। এই সংবাদ মিডিয়া পেলে ছাপবে, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু গতকাল বোর্ডের মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুস ও ক্রিকেট অপারেশন্সের চেয়ারম্যান বললেন, মিডিয়াতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিচালকের এসব কথাই জার্গুনসেনকে পদত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছে! আকরাম বলছিলেন, ‘শেন মিডিয়াতে দেখেছে কিছু কিছু পরিচালক তাকে দলে কোচ হিসাবে না রাখার বিষয়ে কথা হয়েছে; কিন্তু অফিসিয়ালি আমাদের সাথে এ ধরনের কোন কথা হয়নি। এ বিষয়ে যে চিঠি আসবে সেটা আমরা আশা করিনি।’ আকরামই জানালেন, বোর্ড সভা শুরুর মিনিট পাঁচেক আগে তারা শেন জার্গুনসেনের এই মেইল পেয়েছেন। তাতে কী কারণ লেখা হয়েছে, সেটা কেউ বলেননি। তবে জালাল ইউনুস বললেন, ‘আমি যতটুকু জানি কোন কারণ উল্লেখ করেনি। এটা হতে পারে মিডিয়াতে কোন নিউজ এসেছে। এটার উপর নির্ভর করে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ মিডিয়াই ঘটাক আর কোনো বোর্ড পরিচালকের কথায়ই ঘটাক; ঘটনা ঘটে গেছে। তারপরও সুযোগ আছে, জার্গুনসেনকে অন্তত ভারতের বিপক্ষে সিরিজ পর্যন্ত রেখে দেয়ার। সেটা চেষ্টা করবেন কি না, পরিষ্কার না করলেও আকরাম বললেন, ‘শেন বলেছেন, যদি আমরা চাই তবে জুন পর্যন্ত রাজি আছে আমাদের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে। ওর চিঠি পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে ইমোশনালি শেন পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছে।’