কিংকর্তব্যবিমূঢ় বিসিবি

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৪, ২২:০৩
পৃথিবীতে কোচ নাকি দুই ধরনের—এক দলের চাকরি গেছে, আরেক দলের চাকরি যাবে! বহু ব্যবহারে এই রম্য উদ্ধৃতিটা ক্লিশে হয়ে গেলেও বাংলাদেশের জন্য এটা এখনও দারুণ সত্যি একটা কথা। গত বছর তিনেক ধরে বাংলাদেশের কোচের চেয়ারটা তো মিউজিক্যাল চেয়ারে পরিণত হয়েছে। কে আসছেন, কে যাচ্ছেন; সেটা হিসেব রাখা যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে বলুন তো, এখন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ কে? এখানেই মজাটা। বোর্ডের বেশ কয়েকজন ক্ষমতাশালী পরিচালক ক’দিন আগে পর্যন্ত চাচ্ছিলেন শেন জার্গুসনকে বরখাস্ত করা হোক, জার্গুসন নিজেই পদত্যাগ করে গত পরশু জটিলতা কমানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিচিত্র ব্যাপার হল, জার্গুসনের এই পদত্যাগপত্র পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে খুব জটিল করে ফেলেছে। এতোটাই জটিল হয়ে গেছে পরিস্থিতি যে, খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে বিসিবি। এখন বোর্ড কর্মকর্তারা পরিষ্কার যে, ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে হাই প্রোফাইল কোনো স্থায়ী কোচ পাওয়া সম্ভব না তাদের। ভারতের সফর পর্যন্ত জার্গুনসেনকে রাখা সম্ভব হলেও এরপর কী হবে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে জটিলতা। আর এই জটিলতা থেকে রেহাই পেতেই শেন জার্গুনসেনকে ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত রেখে দেয়ার মতো চেষ্টাও করার পক্ষে কোনো কোনো বোর্ড পরিচালক। মানে আরো একবার ‘ইউ টার্ন’ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)! আসলে এই একশ’ আশি ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে ভেতরের দাবা খেলাটা একটু বোঝার দরকার। হ্যাঁ, দাবা খেলাই বটে। সেটাই করতে চাচ্ছিল ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু খেলাটায় শেষ চাল দিয়ে প্রায় কিস্তি মাতের উপক্রম করেছেন জার্গুনসেন। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময়। তখন দলের পারফরম্যান্স খারাপ দেখে অনেক কর্মকর্তা সরাসরি কোচের মুন্ডু চাচ্ছিলেন। এই সাবেক পেস বোলিং কোচকে আর চলে না বলেও রায় দিয়ে দিচ্ছিলেন তারা ভেতরে ভেতরে। এমনকি বোর্ড সভাপতি টুর্নামেন্ট চলা অবস্থায়ই বলে বসলেন, টুর্নামেন্ট শেষে দলে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বিশ্বকাপ শেষ হতে হতে এই উত্তেজনা একটু থিতিয়ে এলো। বোর্ড কর্মকর্তারা বাস্তবতা বুঝতে পারলেন—বাংলাদেশের জন্য হাই প্রোফাইল কোচ পাওয়াটা কার্যত সোনার খনির সন্ধান করার মতো। অন্তত দুটি কারণে গত বছর চারেকে বাংলাদেশে কোনো কোচ এসে টিকতে পারেননি—প্রথমত বোর্ডের সঙ্গে বনিবনা হয় না এবং দ্বিতীয়ত দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করার অভ্যেসই নষ্ট হয়ে গেছে বড় কোচদের। জেমি সিডন্স বিদায়ের সময় অসন্তুষ্টই ছিলেন। তারপর স্টুয়ার্ট ল ও রিচার্ড পাইবাস রীতিমতো অসন্তোষ প্রকাশ করে চাকরি ছেড়েছেন। এতে বিসিবি সম্পর্কে একটা বাজে ধারণাও ছড়িয়েছে—তারা বড় কোচ হ্যান্ডেল করতে পারে না। আরেকটা জটিলতা হল, বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি লিগে দুই-তিন মাসে বড় অংকে আয় হয় বলে আগের মতো তিন-চার বছর মেয়াদী চুক্তি কোনো কোচ এখন আর করতে চান না। এই ক্ষেত্রে বিসিবি ভেতরে ভেতরে খেলতে চাইলো। তাদের ইচ্ছে ছিল, জার্গুনসেনকে দায়িত্বে রেখেই একজন কোচ খোঁজা হবে। তাতে সময় লাগলেও ক্ষতি নেই—জার্গুনসেন তো ঠেকা চালাচ্ছেনই। কিন্তু ঝামেলাটা তৈরি হয়ে গেল, এই মূল মনোভাব নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিসেবে কোনো কোনো বিসিবি কর্মকর্তা মিডিয়ায় বলে দেয়ায়। তাতে জার্গুনসেন বুঝে গেলেন, কোচ যেহেতু বিসিবি খুঁজছে, তার ভবিষ্যত্ ভালো না। ফলে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে খেলাটা নিজের হাতে নিয়ে নিলেন জার্গুনসেন। এখন বোর্ডকেই পরের চালটা দিতে হবে এবং তাদের কার্যত পিঠ দেয়ালে ঠেকানো। আজ থেকে দশ মাসের কাছাকাছি সময়ে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপ খেলতে যেতে হবে বাংলাদেশকে। এর আগে দলকে নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সময় কোচকে দিতে চাইলে রাত পোহালেই কোচ চাই বিসিবির। সেটা কোথায় পাওয়া যাবে? এমন সংকট তৈরি হওয়ায় বাতাসে কিছু নাম দ্রুত ভাসতে শুরু করেছে—পাকিস্তানের চাকরি ছাড়া সাবেক বাংলাদেশি কোচ ডেভ হোয়াটমোর, নিউজিল্যান্ডে থাকা আরেক সাবেক জেমি সিডন্স, উপমহাদেশের কোনো কোনো সাবেক ক্রিকেটার, এমনকি দেশের সাবেক এক টেস্ট অধিনায়কের নামও গুঞ্জন আকারে শোনা যাচ্ছে। এখন সমস্যা হল, এতো দ্রুত এতো বড় সিদ্ধান্তে কিভাবে পৌঁছানো যাবে? এই সংকট সমাধানের একটা প্রাথমিক সূত্র বিসিবির হাতে আছে। তারা চাইলে সাধারণ সমঝোতা করেই জার্গুনসেনকে আগামী মাসে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ পর্যন্ত রেখে দিতে পারে; তেমনটা জার্গুনসেন পদত্যাগপত্রে বলেছেন। আর বিসিবির কেউ কেউ বলছেন, সমঝোতার হাতটা আরেকটু লম্বা করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এই অস্ট্রেলিয়কে ২০১৫ পর্যন্তই রেখে দেয়া হোক। তাতে নতুন কোচ খোঁজার পুরোনো সময়টা পাওয়া যাবে। এখন কথা হল, জার্গুনসেন সেই সুবিধা দেবেন কি না!