আম্পায়ারিং এখন যন্ত্রের হাতে

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৬
ডিকি বার্ড সম্ভবত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম তারকা আম্পায়ার ছিলেন তিনি। তার চেয়ে বড় কথা সত্তরের দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের খ্যাপাটে সব কিংবদন্তী ক্রিকেটারকে মাঠে সামলেছেন বড় কোনো বিতর্ক ছাড়াও। আজও আম্পায়ার বলতে অনেকেই সাদা টুপি, সাদা কোটের সেই হাস্যোজ্জল মানুষটিকে বোঝেন। হ্যা, হ্যারল্ড ডেনিস বার্ড ওরফে ডিকি বার্ড! মাত্র ক দিন আগেই নিজের ৮১তম জন্মদিন পূরণ করলেন ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ৬৬টি টেস্ট ও ৬৯টি ওয়ানডে পরিচালনা করা কিংবদন্তী এই আম্পায়ার। এখন ক্রিকেট মাঠের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও খেলাটা নিয়মিত দেখেন। দেখেন বদলে যাওয়া এই সময়কে; যখন তার উত্তরসূরীদের কাজে ভাগ বসিয়েছে থার্ড আম্পায়ার, হট স্পট, হাজারো ক্যামেরা, সেন্সর। এই সময়টাকে এবং নিজের ক্যারিয়ারকে ফিরে দেখেছেন ডিকি বার্ড। ক্রিকইনফোকে দেয়া সেই বিশেষ সাক্ষাত্কার— আপনার প্রথম কাজ কী ছিল? কয়লার খনিতে কাজ করতাম। ক্রিকেটে আসার আগে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত খনিতে ফিটার হিসেবে কাজ করেছি। নিজেকে কিভাবে বর্ণনা করবেন? আম্পায়ার হিসেবে সত্ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলাম। আমি মাঠে উপস্থিত প্রত্যেককে আগে মানুষ হিসেবে, তারপর পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে দেখতাম। এর মধ্যে একজনও যদি আজ আমাকে শ্রদ্ধা করে, তাহলেই অসাধারণ ব্যাপার। শেষ টেস্টের কথা বলুন। ইংল্যান্ড ও ভারতের খেলোয়াড়রা গার্ড অব অনার দিয়ে বিদায় দিয়েছিল আমাকে। আমি ঠিক জানতাম না, খেলোয়াড়রা কী পরিকল্পনা করছিল; তবে কিছু যে হচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম। খেলা শেষে লর্ডসের লং রুম ধরে হাঁটছি; দেখলাম, সবাই দাঁড়িয়ে হাতে তালি দিচ্ছে। দু’দল দু’পাশে দাঁড়িয়ে আমার হাঁটার জন্য একটা পথ বানিয়ে দিলো। আমার গলায় কিছু একটা যেন আটকে গিয়েছিল, চোখে জল চলে এসেছিল। যারা ডন ব্র্যাডম্যানের শেষ টেস্ট দেখেছে, তারা বলেছে, আমার বিদায়টা বেশি ভালো ছিল! ঘড়ির কাটা পিছিয়ে পেছনে চলে যেতে পারলে কী করতেন? ইয়র্কশায়ার দলে নিয়মিত খেলোয়াড় হতাম। আমি দলে কখনো নিয়মিত ছিলাম না; ঢুকতাম, বের হতাম। এটা নিয়ে খুব আফসোস হয় এখনও। আপনাদের সময় আর এখনকার সময়; আম্পায়ারিং কতোটা বদলেছে? আমাদের ডেলিভারির মুহূর্তে নিচে তাকিয়ে নো বল দেখতে হত, বল কানা নিয়েছে কি না দেখতে-শুনতে হত, বল কোথায় পড়ল বুঝতে হত; অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হত। এখন আমার মনে হয় আম্পায়ারদের কাছ থেকে প্রায় সব ক্ষমতাই নিয়ে নেয়া হয়েছে। আমি বলি, এখন তো যন্ত্রই আম্পায়ারিং করে। আম্পায়ারিংয়ের দিক থেকে দেখলে, এটা খুব দুঃখজনক; আমরা যে আম্পায়ারিং জানতাম তা আর নেই। আমাকে জিজ্ঞেস করলে এখনকার সেরা আম্পায়ারের নাম বলতে পারবো না! তাহলে আপনি কি প্রযুক্তির বিপক্ষে? দেখুন, পক্ষে-বিপক্ষে কিছু যায় আসে না। এই প্রযুক্তিগুলো থাকতেই এসেছে। সবাই এসব ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির পারফরম্যান্স দেখতে চায়। ফলে এগুলোই থাকবে। ব্যাটসম্যানের কী ওয়াক করা উচিত? কেউ ওয়াক (আউট জানলে চলে যাওয়া) না করলে আমি রাগ করি না। আইনে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আম্পায়ার আউট দিলে অন্তত ওয়ানক করা উচিত! ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের অভিজ্ঞতা বলুন। আমার জীবনে পরিচালনা করা অন্যতম সেরা ম্যাচ। তবে আমাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমর্থকরা খুব ভুগিয়েছিল। এক বক্স সাদা ক্যাপ ব্যবহার করতে হয়েছিল। প্রতি ম্যাচের পর কোনো না কোনো সমর্থক মাঠে ঢুকে ছো মেরে টুপি নিয়ে যেত। ফাইনালের টুপিটা রাখতে চেয়েছিলাম। তাও খেলা শেষ হতেই এক লোক নিয়ে দৌড় দিয়ে ভিড়ের মধ্যে চলে গেল। টুপি নিয়ে তো বাসেও আপনার একটা অভিজ্ঞতা আছে? হ্যাঁ, লন্ডনে। বাসে উঠে দেখি কান্ড্রাক্টরের মাথায় আমার একটা টুপি। বললাম, ‘স্যার, আপনি এটা কোথায় পেয়েছেন?’ উত্তর দিলো, ‘আপনি ডিকি বার্ডের নাম শোনেননি? আমি ওনার মাথা থেকে ছো দিয়ে নিয়েছিলাম।’ ক্রিকেটে এলেন কেন? আমার প্রথম ভালোবাসা ফুটবল। ক্রিকেটও খেলতাম। তবে ১৬-১৭ বছর বয়সে ক্রিকেটে এলাম। কারণ দুটো খেলা চালাতে পারতাম না। ক্রিকেটে এসে ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ হয়েছে। আপনার দেখা সেরা ক্রিকেটার কে? গ্যারফিল্ড সোবার্স। একজন সত্যিকারের গ্রেট খেলোয়াড়। একজন বিনোদনদাতা, সেরা খেলোয়াড়; সবচেয়ে বড় কথা একজন ভদ্রলোক। এখনকার খেলোয়াড়দের মধ্যে? এখনকার জ্যাক ক্যালিসের খেলা দেখতে ভালো লাগে। শচীন টেন্ডুলকার ও ব্রায়ান লারার খেলা দেখা তো অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু তিনজনই তো ফুরিয়ে গেল। দুঃখজনক। মাঠের কিছু মিস করেন? ওই সময়ে মাঠে খুব মজা হত। খেলোয়াড়রা আম্পায়ারদের সঙ্গে মজা করতো, আমরাও কৌতুক করতাম। দারুণ একটা পরিবেশ ছিল।