আষাঢ়ের বৃষ্টি ভ্যাপসা গরমে ওষ্ঠাগতপ্রাণ রাজধানীবাসীর জন্য কিছুটা স্বস্তি বহিয়া আনিলেও দেখা দিয়াছে নূতন বিড়ম্বনা। সেই বিড়ম্বনার নাম জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুম সবেমাত্র শুরু হইয়াছে। কিন্তু সামনের দিনগুলি যে মোটেও স্বস্তিকর হইবে না—গত মঙ্গলবারের সামান্য বৃষ্টিতেই তাহার পূর্বাভাস স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। জলাবদ্ধতা দেখা দিয়াছে রাজধানীর বহু এলাকায়। নিম্নাঞ্চল ও পুরনো ঢাকা শুধু নহে—মতিঝিল, পুরানা পল্টন, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশান ও বাড্ডার বহু সড়কও তলাইয়া গিয়াছে বৃষ্টির পানিতে। স্থানবিশেষে সেই জলাবদ্ধতা কয়েকঘণ্টা হইতে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হইতেছে। ফলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি সৃষ্টি হইতেছে মারাত্মক যানজটও। রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সমস্যা যেমন নূতন নহে, তেমনি এই সমস্যার মূল কারণগুলিও কমবেশি সকলেই জানেন। নগর পরিকল্পনাবিদরা আবারও তাহা আমাদের স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন। তাহারা বলিয়াছেন যে, মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থাই ইহার জন্য দায়ী। কথাটির যথার্থতা লইয়া দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নাই। একদা রাজধানীতে বহু খাল ছিল। এই খালগুলিই ছিল পানি নিষ্কাশনের প্রধান অবলম্বন। অথচ অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বেশিরভাগ খালই লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। অন্যদিকে, গত কয়েক দশকে রাজধানী দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে যেইভাবে বাড়িয়াছে এবং ইহার জনসংখ্যা যেইভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে সেই অনুপাতে যে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হয় নাই তাহাও সুবিদিত। তবে এই অজুহাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও নগরবাসীর অসচেতনতার বিষয়টিও আড়াল করা যাইবে না।
ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ যে হয় নাই তাহা নহে। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ব্যাপক কাজ হইয়াছে বিগত বত্সরগুলিতে। এখনও হইতেছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতিও যে হইয়াছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, শান্তিনগর ও রোকেয়া সরণিতে জলাবদ্ধতার তীব্রতা যেমন হ্রাস পাইয়াছে, তেমনি কমিয়াছে তাহার স্থায়িত্বও। বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, মুম্বাই, ম্যানিলাসহ বিশ্বের বড়ো বড়ো মহানগরগুলিতেও জলাবদ্ধতা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অত্যধিক বৃষ্টিপাতই ইহার কারণ। তবে আমাদের সমস্যার ধরন কিছুটা ভিন্ন। বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর রাখিবার জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হইলেও এই ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করিয়া বর্ষা মৌসুমের আগে সবধরনের নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা অত্যাবশ্যক হইলেও অভিযোগ আছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাহার তোয়াক্কা করা হয় না। অন্যদিকে সোয়া কোটি রাজধানীবাসীর ব্যবহূত প্লাস্টিকজাত সামগ্রী ও পলিথিন এবং অন্যান্য বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও নিক্ষিপ্ত হয় এইসব নালা-নর্দমায়। ফলে যেইসব স্থানে জলাবদ্ধতা হইবার কথা নহে সেইখানেও জলাবদ্ধতা হইতেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা ও নগরবাসীর সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যার কার্যকর সমাধান যে সম্ভব নহে তাহা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ অবশ্য একটি সুসংবাদ শুনাইয়াছেন। সেইটি হইল, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজ চলিতেছে। আগামী এক বত্সরের মধ্যে ইহার সুফল পাওয়া যাইবে বলিয়া তাহারা আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছেন। সেইসাথে ইহাও বলিয়াছেন যে, রাজধানীর বিলুপ্ত খালগুলি উদ্ধার অভিযানও অব্যাহত আছে। জলাবদ্ধতা সমস্যার নিরসন শুধু নহে, রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্যও খালগুলি উদ্ধার করা অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে। গত এক দশক যাবত্ এই ব্যাপারে আশার বাণী শোনানো হইলেও অগ্রগতি যে খুব একটা আশাব্যঞ্জক নহে তাহা স্পষ্টতই দৃশ্যমান। দীর্ঘসূত্রতার যৌক্তিক কারণও হয়তো আছে। তবে সমস্যাটি এতোটাই জটিল ও নাজুক যে যতো কালক্ষেপণ হইবে, সমাধানের পথও ততোই দুর্গম হইয়া পড়িবে।
