আমরা স্বাধীন হতে বাধ্য হয়েছি উর্দুভাষী পশ্চিম-পাকিস্তানিদের আগ্রাসিকতার প্রাবল্যে। তারা মনে করেছিল বাঙালিরা হীনবল, শিক্ষা-দীক্ষায় পশ্চাদপদ জাতি। অতএব পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে পারবে আজীবন। ওরা বিস্মৃত হয়েছিল সিরাজদ্দৌলাকে, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতাদের মত অগ্নিকুণ্ডকে। যাদের দেশপ্রেম আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে জ্বলজ্বল করছে। যারা আজও আমাদের প্রেরণার উত্স, যাদের নীতি-আদর্শে আজও আমরা উজ্জ্বীবিত হই। পশ্চিমারা মূল্যায়ন করেনি বাংলার বাঘ ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মত রাজনীতিবিদদের, যাদের সমগ্র জীবনটাই নিবেদিত ছিল এ দেশটার জন্য, নজের কথা, কংবা পরিবারের কথা কখনই তাদের চিন্তায় ছিল না, ছিল শুধু এদেশ আর এদেশের অগণিত খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতি অগাধ ভালবাসা। তাই তাঁরা পেরেছিলেন বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে, পেরেছিলেন পশ্চিমা অপশাসন থেকে বাঙালিকে মুক্ত করতে। তারা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয়, তারা রাজনীতি করেছেন দেশের স্বার্থে, দেশবাসীর মঙ্গল চিন্তাই ছিল তাদের ধ্যান-জ্ঞান। কখনও তাদের মনে দেশের স্বার্থ-বিরোধী কোন নষ্ট চিন্তা উঁকি দেয়নি, দেশের সম্পদ নয়-ছয় করে ব্যক্তিস্বার্থের চোরাগলিতেও আটকে থাকেননি তারা। রাজনীতিবিদ বলতে আমরা আজও তাদেরই বুঝি, কারণ প্রকৃত দেশপ্রেম তারা সযত্নে লালিত করেছেন মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের দেহে ও মনে। কখনও শুনিনি কিংবা দেখিনি তারা বাড়ি-গাড়ি-ব্যাংক-ব্যালেন্সে ফুলে-ফেঁপে উঠেছেন, ভাবি কয়েক পুরুষের জন্য সম্পদের পাহাড় জমিয়েছেন। কখনও শুনিনি এসব। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের দেশের সম্পদ তুলে নিয়ে নিজেরা হয়েছিল সম্পদশালী। তীব্র ঘৃণাই তাই তাদের বিতাড়িত করার মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছিল। আমরা হয়েছিলাম পূর্ণ স্বাধীন, ২৪ বছরের অত্যাচার আর অপশাসনের ঘৃণ্য যন্ত্রণা থেকে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ চেতনাই আমাদের মুক্ত করেছিল, সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে বিভোর করেছিল। এমন এক দেশ গড়তে চেয়েছিলাম আমরা যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্িবশেষে আমরা সবাই এক পতাকা তলে মাথা উঁচু করে বাঁচবো। কিন্তু আমাদের সে স্বপ্ন-সাধ কি পূরণ হয়েছে আজও? স্বাধীনতার ৪২ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু কোথায় সেই চেতনার দীপশিখা? কোথায় সেই দেশপ্রেমের উদারতা?
আমরা দেখেছি, আমরা শুনেছি রাজনীতিবিদদের কঠিন তপস্যাময় জীবনের কথা, যেখানে নিজের প্রাপ্তি বলতে কিছুই ছিল না, সব অর্জনই তারা উত্সর্গ করেছিলেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু এখন সে আদর্শ, সে ত্যাগ-তিতিক্ষা কোথায়? পরিসংখ্যানে জানা গেছে ব্যবসায়ী সমপ্রদায়ই এখন রাজনীতিতে ঝুঁকছে বেশি, যাদের কাছে লাভ-লোকসানের হিসেবটাই মুখ্য, জনসেবা গৌণ। অথচ আগে এ অঙ্গনে আইনজীবীদের পদচারণাই ছিল বেশি, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাটা যাদের ধর্ম ছিল। তাদের সংখ্যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে রাজনীতিবিদেরা এখন আর ভাঙা-চোরা ঘর কিংবা ভাঙা আসবাবের বাসিন্দা নন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই আছে আলিশান বাড়ি, একের অধিক গাড়ি, ব্যাংকে প্রচুর টাকা, মিল, ফ্যাক্টরি, গার্মেন্টস, অত্যাধুনিক ক্লিনিক, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির মালিকানা রয়েছে অনেকের। কি করে এত সম্পদ হলো তাদের? এগুলো কি পৈতৃক সম্পত্তি? তাই বা কী করে হয়? এরা ক’জন স্ব স্ব এলাকার উন্নয়নে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করেন? করেন কি কেউ? প্রকৃত দেশপ্রেমিক যারা, প্রকৃত রাজনীতিবিদ যারা তারাতো নিজেকে উজাড় করে দেয়াতেই সন্তোষ লাভ করতেন। তেমন রাজনীতিবিদ আছেন কি কেউ বর্তমান আজও এদেশে? যাদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি,যাদের নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে টেনে তুলতে পারি আলোর দিকে?
বর্তমান রাজনীতির হাল-হকিকত দেখে মনে পড়ছে সেই প্রবাদটির কথা—যে যায় লংকায়, সেই হয় রাবণ। অর্থাত্ ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু অত্যাচারের অবসান হয় না,শোষিত-নিপীড়িতের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় না আলো-ঝলমল কোন সূর্যের।
রাজনীতি যদি ব্যক্তি-স্বার্থের থলিতেই বন্দি থাকবে তাহলে দেশের মঙ্গল কারা করবে? তাই সে রাজনীতির চর্চা আর আমরা সাধারণ মানুষেরা দেখতে চাই না। ত্যাগের বদলে ভোগ-লালসায়ই যাদের অধিক সুখ,তারাতো এ পবিত্র অঙ্গনে বাস করার অধিকারই রাখেন না। ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা ও সম্পদ ভোগ করার যে চমত্কার ব্যবস্থা তারা করে নিয়েছেন নিজের ও তাদের ভবিষত্ কয়েক প্রজন্মের জন্য, তাতে তো তাদের এ সাইনবোর্ডের আর দরকার নেই। ইতিহাস তাদের ঠিকুজী-কুষ্ঠী লিখে ফেলেছে,কালের করাল গ্রাস থেকে তাদের মুক্তি নেই। এখন তারা যদি স্বেচ্ছায় বিদায় নিতে চান রাজনীতি থেকে, (আদর্শ থেকে তো বিদায় অনেক দিন আগেই নিয়েছেন।) নিতে পারেন, আমাদের কোন আপত্তি নেই। রাজনীতির পবিত্র প্রাঙ্গণে ব্যক্তি লালসার কলুষিত ছায়া আর আমরা দেখতে চাই না। আমরা রাজনীতির সেই সত্য-সুন্দরের আলোক-চ্ছটা দেখতে চাই, যে আলো প্রাসাদে আবদ্ধ থাকবে না, আলোকিত করবে জীর্ণ-শীর্ণ আদুল গায়ের ঐ শিশু-কিশোর-কিংবা বৃদ্ধকে। স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার এবং বেঁচে থাকার আশ্বাস দেবে।
লেখক : প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, বাউফল,পটুয়াখালী।
[email protected]
