খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে চাল ছাড়া অন্য উপাদান কমিয়ে বাজার খরচ কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব। তবে গড়পরতায় বেশি আয়ের পরিবারে খাদ্যের চেয়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতে খরচ বেশি হয়। বাড়ি ভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিত্সা ও গৃহস্থালিসহ নানা সেবার পেছনে খরচ বাড়ছে। এই খাদ্যবহির্ভূত খাতে খরচ কমানো সম্ভব হয় না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে আয়ও বাড়ায় মানুষের কষ্ট হচ্ছে না বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ায় এবং নিত্যপণ্যের, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস, বড় বড় কর্পোরেট হাউজের বেহাল দশা, শেয়ার বাজারে মন্দা, চাকরির বাজারে আকালসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের আয়ের সূচক নিম্নমুখী। বহু কর্পোরেট হাউজেই নিয়মিত বেতন ভাতা হচ্ছে না। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ মাসের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না প্রতিমাসে। সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত হলেও তারাও মূল্যস্ফীতির শিকার। নাজুক এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুত্, বাড়ি ভাড়া, শিক্ষা ব্যয় এবং চাল, ডাল, তেল, লবণসহ সবধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের জীবনযাত্রা অচল প্রায়। কেবল চাকরিজীবী কিংবা ব্যবসায়ীই নয়, সর্বস্তরের মানুষই কঠিন এক সময় পার করছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির রেশ কাটার আগেই আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদ্যুত্ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতিকে আরো উস্কে দেবে। এতে দেশের মানুষ আরো খারাপ অবস্থায় পড়বে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। একই সময়ে মাঝারি চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ১৮ শতাংশ। আর মোটা চালের দাম এক বছরে বেড়েছে ১৩ শতাংশ। সবকিছুর প্রভাবে এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে সরকারের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এই সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে শহর অঞ্চলে খাবারের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। এভাবে দফায় দফায় দাম বাড়লেও সেই হারে বাড়ছে না চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষের আয়। তাই বাড়তি মূল্যের প্রভাবে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জরিপ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১১ শতাংশ। চালের ক্ষেত্রে গড়ে মূল্য বেড়েছে ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ। বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আর বিদ্যুত্ ও পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল্য বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার গড় ব্যয় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৭০ ও ৫ দশমিক ০১ শতাংশ বেড়েছে। সর্বশেষ গত মাসে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। টিসিবি, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতর এবং ক্যাব সূত্রে জানা গেছে, এক বছরে সব ধরনের সবজির গড়ে দাম বেড়েছে ২০ ভাগ।
ক্যাবের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্যাকেট ও খোলা আটা, ময়দা এবং সুজি ব্যবহারে জীবনযাত্রার গড় ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। হিসাব অনুযায়ী মাছ কেনার কারণে গড় ব্যয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ। মোরগ-মুরগির গোশতে ব্যয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আদা, রসুন, পেঁয়াজ, শুকনো ও কাঁচামরিচের মতো পণ্যে ব্যয় বেড়েছে ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ। এর পাশাপাশি অন্যান্য মশলায় ব্যয় ১৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেড়েছে। এভাবে সব পণ্য ও সেবার দাম বাড়ছে।
অন্য একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের দৈনিক খরচ মেটাতে এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। বিপরীতে আয় বেড়েছে মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশ। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। গন্তব্য যত কাছেই হোক ঢাকা শহরে ২০ টাকার নিচে রিকশা ভাড়া নেই। ফলে গত এক বছরে মানুষের যাতায়াত ব্যয় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। যানবাহনের ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের ভ্রমণ ব্যয় বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও কোচিং সেন্টারের খরচসহ ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। তাই সরকারের উচিত মূল্যস্ফীতি কমানোর ব্যবস্থা করা। জনগণের কষ্ট যতটা পারা যায় লাঘব করা।
লেখক :গবেষক
