‘নখে রঙ করতে ভালো লাগতো আমার। মা এতে কিছু না বললেও বাবা বিষয়টি পছন্দ করতেন না। বরং তিনি চাইতেন আমি যেন ক্রিকেট খেলতে যাই। আমি কেমন আচরণ করব কিংবা আমার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়েই আমি দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। একসময় বিচ্ছিন্ন বোধ করতে লাগলাম। নামকরা একটি বয়েজ স্কুলে পড়লেও সেখানে কারো সাথে মিশতে পারিনি। স্কুল ছুটির সময় দাঁড়িয়ে থাকতাম গাছের নিচে, নিজেকে বন্ধুদের থেকেও আলাদা অনুভব করতাম। একসময় বুঝতে পারলাম, আমি আমার ১৪ বছর বয়সী ছেলে সহপাঠীর প্রেমে পড়েছি!’ কথাগুলো বলছিলেন আলী আজগর তারা।
একসময় যিনি বুঝতে পারেন তিনি একজন ট্র্যান্সজেন্ডার নারী। বাহ্যিকভাবে ছেলেদের মতো হলেও নিজের ভেতরে নারীসত্ত্বা অনুভব করতে লাগলেন। তবে নিজের এই বৈচিত্র্যের কারণে নানা প্রতিকূলতা পার করেও সফল হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের পেস ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বসবাস করছেন নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে এবং হিজড়াদের চিন্তাভাবনা, তাদের সীমাবদ্ধতা, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। আলী আজগর তারা একাধারে একজন শিল্পী, গবেষক ও সমাজকর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক সম্পন্নের পর তিনি শিকাগোর স্কুল অব আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে চারুকলায় উচ্চতর পড়াশোনা করেন।
তারা বলেন, ‘আমি সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুয়ের সম্পর্কে জানতাম না। আমি একজন নারীর মতো অনুভব করতে শুরু করলাম। ঋতুপূর্ণা ঘোষের সিনেমাগুলো আমাকে অনেক স্পর্শ করেছিল। আমার কণ্ঠস্বর মেয়েদের মতো হওয়ায় ব্যাঙ্গবিদ্রুপও শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি কখনোই নিজেকে পুরুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে পছন্দ করতাম না। যখন কাস্টমার সার্ভিস থেকে কেউ আমাকে ম্যাম বলে ডাকে, আমি তা পছন্দ করি।’
বাংলাদেশের সমাজে তারার নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, হিজড়া বা ট্র্যান্সজেন্ডারদের প্রতি সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ, লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যসহ নানা বিষয় ফুটে ওঠে তার কাজের মধ্য দিয়ে। ২০০৮-২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্যুয়ের শিল্পী হিসেবে তারা বাংলাদেশে, জাতীয় চিত্রশালায়; শিল্পকলা একাডেমির নবীন এবং জাতীয় শিল্প প্রদর্শনীতে, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে ঢাকা আর্ট সামিটে, বেঙ্গল ফউন্ডেশনে, জার্মান সংস্কৃতি কেন্দ্র গোথে ইনস্টিটিউটে; ব্রিটিশ কাউন্সিল, ঢাকা আর্ট সেন্টার, বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টসহ বিভিন্ন প্রদর্শনীতে নিজের কাজ প্রদর্শন করেছেন। তিনি মনে করেন, সমাজে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। মানুষের চিন্তাভাবনা বদলাচ্ছে। জেন্ডার কারোর নিজস্ব চিন্তার বিষয়—এটা কেউ বুঝতে চাইত না| কিন্তু এই ধারণা একসময় বদলাবে।
