যুদ্ধ এবং নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২২, ০৩:০৬

মানব ইতিহাসে যুদ্ধ, সংঘাত, হানাহানি নতুন কিছু নয়। সেই আদিম যুগ থেকেই মানুষ নিজেদের বিভক্ত করে নিয়েছে আর বিভক্তি সূত্রপাত ঘটিয়েছে সংঘাতের। কালের বিবর্তনে আমাদের বাহ্যিক উন্নয়ন ঘটেছে। সভ্যতার চাদর আমরা গায়ে জড়িয়েছি ঠিকই, তবে ভেতরের কদর্য এখনো মুছে ফেলতে পারিনি। ফলে একের প্রতি অন্যের হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিশোধস্পৃহা থেমে থাকেনি। ফলাফল যুদ্ধ, হানাহানি, রক্তপাত। যুদ্ধ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির কারণ। যুদ্ধের বাতাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু পরিবার। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়, কোনো রকম প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়াই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা। যুদ্ধকালীন নারীর প্রতি সহিংসতা এতটাই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে, বলা হয়, ‘যুদ্ধাহত নারীর শরীর হলো একধরনের খাম, যা যুদ্ধের ভয়াবহতার বার্তা বহন করে।’

নারী ও শিশু সুরক্ষার গান গাইলেও যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রগুলো সেই সব প্রতিশ্রুতি কতটুকু মনে রাখে, তার বর্ণনা পাওয়া যায় মানব ইতিহাসে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর দিকে তাকালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনী ধর্ষণকে ব্যবহার করেছিল ‘ওয়েপন অব টেরর’ হিসেবে। জাপানিরা তাদের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে তিন থেকে চার লাখ নারীকে যৌনদাসত্বে বাধ্য করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি মিলিটারি ও তাদের দোসর দ্বারা ২ লাখ নারী ধর্ষিত হয়। ইউএনএসপির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বসনিয়ার যুদ্ধে যুদ্ধসংশ্লিষ্ট ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা প্রায় কয়েক লাখ। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা জেনোসাইডে যৌন সহিংসতার শিকার ৬৭ শতাংশ নারী পরে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়। এছাড়া লাইবেরিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, চেচেন যুদ্ধেও দেখা গেছে একই চিত্র। আইসিআরসির ইরাক যুদ্ধ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকি নারীরা সিভিল সমাজকে আক্রমণকারী যেকোনো সশস্ত্র সহিংসতার বড় শিকার।

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী বিশেষ যত্ন ও সহায়তা প্রতিটি শিশুর প্রাপ্য হলেও বর্তমান সময়ে যুদ্ধ ও সংঘাতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মৃতু্য হচ্ছে শিশুদের, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যার সংখ্যা যুদ্ধে প্রাণ হারানো সৈনিকের চেয়েও বেশি। জাতিসংঘের সিরিয়া সংকটের ২০১৪-এর রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তিন বছরের গৃহযুদ্ধে সেখানকার প্রায় ১০ হাজার শিশুর মৃতু্য হয়েছে এবং বাস্ত্তচু্যত হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ। ইয়েমেন যুদ্ধবিষয়ক ইউনিসেফের তথ্যমতে, সেখানে সাত বছরে ১০ হাজারেরও অধিক শিশু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইরাকযুদ্ধে শিশুদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বাধ্য করা এবং শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করার মতো ঘটনার নজিরও রয়েছে। সর্বশেষ ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক লাখ শিশু নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে এবং ঝুঁকিতে রয়েছে এখনো ৩০ লাখ নারী ও শিশু। যুদ্ধকালীন শিশুর প্রতি নির্যাতন জাতিসংঘ শিশু সনদের পরিপন্থি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংঘবদ্ধতা সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন নারী ও শিশুরা সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে, যা স্পষ্টতই সংশ্লিষ্ট সংস্হাগুলোর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

যুদ্ধ মানেই সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। যুদ্ধ নারী ও শিশুর থেকে ছিনিয়ে নেয় তার পরিচয়, বেঁচে থাকার অধিকার, মানবিক মর্যাদা। বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধসংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারও হয় কদাচিত্। ফলে খুব সহজেই যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের টার্গেট করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে স্হান হয় না সম্ভম হারানো নারীদের। যুদ্ধশিশুদের মেনে নিতে চায় না কোনো সমাজ। শরণার্থী হিসেবে যেসব নারী ও শিশু অন্যান্য রাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়, তাদেরও যাপন করতে হয় মানবেতর জীবন। যুদ্ধাহত বেশির ভাগ নারী ও শিশু খাদ্যের সংকট ও পুষ্টিহীনতার কারণে সহজেই আক্রান্ত হয় বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। যুদ্ধের সময় স্বাভাবিকভাবেই জনস্বাস্হ্য সুরক্ষার বিষয়ে ভাটা পড়ে। ফলে নারী ও শিশুস্বাস্হ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া নারী ও শিশু বাকি জীবন যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে, যা তাদের মানসিক দুর্বলতার জন্য দায়ী। এছাড়া পরিবার বিচু্যতি তৈরি করে নিরাপত্তার সংকট। ফলে সহজেই মানব পাচার গোষ্ঠীর টার্গেটে পড়ে তারা। জাতিসংঘের ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম ইউনিটের তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে ৩ লাখ শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটে, যাদের জোরপূর্বক শিশুশ্রম ও যৌন নির্যাতনে বাধ্য করা হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খল পুরুষহীন পরিবারপ্রথার প্রভাবও পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর।

বিশ্বজুড়ে যখনই যুদ্ধ হয়েছে, সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়েছে নারী ও শিশু। যুদ্ধাহত একজন শিশুকে আজীবন যুদ্ধের নৃশংসতা বয়ে বেড়াতে হয়। যুদ্ধে সম্ভম হারানো একজন নারীকে বাকি জীবন সমাজের লাঞ্ছনার সামনে মাথা নিচু করে কাটাতে হয়। সম্প্রতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তাই মানুষ হিসেবে নারীর প্রাপ্য সম্মানকে ফিরিয়ে দিতে, একজন শিশুকে তার সুন্দর ভবিষ্যত্ ফিরিয়ে দিতে রাষ্ট্রনায়কদের আগ্রাসী মনোভাবের পরিবর্তন জরুরি। পৃথিবীকে সবার বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে তাই বিশ্বরাজনীতির একমাত্র এজেন্ডা হওয়া উচিত বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড