রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংকারে যুদ্ধ ও জন্মোৎসব

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২২, ১০:২৭

ঘুমটা ভেঙে গেল। বুনো আঁধারের ছায়া তখনো কাটেনি। চারপাশের কলকাকলি ভোরের জানান দিচ্ছে। ঘুম ভাঙলেও এক মধুর স্বপ্নের ঘোর রয়ে গিয়েছে।

ঘরোয়া পরিবেশে জমে উঠেছে আসর, ঠিক সন্ধ্যার পরপরই। ভাইবোনরা ঘিরে রেখেছে তাঁকে। আজ বন্ধুদের সাথে নিত্য সান্ধ্য আড্ডায় যাওয়া হয়নি আব্বার। অন্যদের সাথেই তিনিও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। মা আজ পায়েস রেঁধেছেন। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে বলছেন: কী রে! তোরা দেরি করছিস কেন? সব তো জুড়িয়ে যাচ্ছে। কেকটা কাটা হোক। মোম জ্বালিয়েছিস?

মার কথাটা কানে বাজছে। আর ভাইবোন-স্বজনদের কোলাহল। ঘুমটা ভাঙলেও হাফিজ বুঝে উঠতে পারছেন না, তিনি এখন কোথায় শঘ্যা পেতেছেন! এখনো কি তবে ভোর হয়নি? পাখিদের ডাক তো শুনতে পাচ্ছেন। হাওয়ায় দোলা গাছপালার মর্মর ধ্বনিও।

জীবনের কঠিন বাস্তবতা সাথে সাথে অনুভব করলেন পিঠের নিচে মাটির স্পর্শে। মাটিতেই পেতেছেন রাত-ঘুমের বিছানা। ঘুমের কী?—ঘুম ঘুম জাগরণের। তাঁরা রাত কাটিয়েছেন এক বাংকারে। তিনি এবং তাঁর সাথে মেজর চৌধুরী। ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর ফরোয়ার্ড অবজারভেশন অফিসার।

আর হাফিজ নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুক্তিবাহিনীর ব্রাভো কোম্পানির। তিনি তাঁর কোম্পানি নিয়ে সিলেটের পাত্রাখোলায়। কয়েকদিন থেকেই এই এলাকায়। চা বাগানের বন-জঙ্গলে।

কাছাকাছিতেই ধলই বিওপি। পাকিস্তানি হানাদার সেনাদের দুর্ভেদ্য ক্যাম্প। দুই কোম্পানি পাকসেনার আশ্রয়কেন্দ্র এই ক্যাম্প। এদেরকে বের করে আনতে হবে এখান থেকে। ক্যাম্পটাকে করতে হবে উত্খাত।

মুক্তিসেনারা সেভাবেই পরিকল্পনা করেছেন। চার্লি কোম্পানির এক অংশ হামলা চালাচ্ছে ধলই বিওপি ক্যাম্পে। ব্রাভো কোম্পানি অবস্হান নিয়েছে পাত্রাখোলা চা বাগানে। আর ওদিকে পাকা সড়কে অবস্হান নিয়েছে ডেল্টা কোম্পানি। পাকসেনাদের কোনোভাবেই হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই দেয়া যাবে না।

চারপাশে এই রণদামামা, আর তার ভিতরে বাস করে হাফিজ স্বপ্ন দেখছেন তাঁর জন্মদিন উত্সবের! তাও আবার ঘরোয়া পরিবেশে! পরিজনদেরকে সাথে নিয়ে!

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

পাশেই মেজর চৌধুরী। ঘুমোচ্ছেন। কতটুকুই বা ঘুম। সারা রাত জাগার ক্লান্তি নিয়ে চোখদুটোকে বিশ্রাম দিতে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছেন। এখানে তো অন্ধকার। বাইরেও বোধহয় এখনো আলো ফোটেনি।

বন-বাদাড়পূর্ণ চা বাগানের পাখিগুলো এর মধ্যেই জেগে উঠে ভোরের আগাম জানান দিচ্ছে।

কাল একটা দিন গিয়েছে। যুদ্ধ তো নিত্যই। কিন্তু কালকের দিনটা ঘটনাবহুল। স্মৃতিময়। কোনোদিনই ভুলবার নয়।

ভাবতে গিয়েই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। বিষণ²তায় ছেয়ে যায়। কাল অকুতোভয় এক যোদ্ধা আত্মবিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু রক্ষা করে গিয়েছেন তাঁর কোম্পানিকে। সিপাহী হামিদুর রহমান।

রণক্ষেত্রের সাহসী শহিদ সৈনিক।

পরিকল্পনা আগেই করা ছিল। সে অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি কোম্পানি নিজ নিজ অবস্হানে পজিশন নেয়।

চার্লি কোম্পানি আক্রমণ চালায় ধলইয়ের পাকিস্তানি আর্মির শক্তিশালী ক্যাম্পটায়। গোলাবর্ষণে অস্হির করে তোলে তাদের। পাকসেনারা তাদের সুরক্ষিত বাংকার থেকে এ আক্রমণ প্রতিহত করে এক পর্যায়ে পাকসেনারা পালটা আক্রমণ শুরু করে। কয়েকজন মুক্তিসেনা আহতও হন।

এ পর্যায়ে সামনে এগিয়ে আসেন সিপাহী হামিদুর রহমান, সাথে তাঁর গোলাবারুদসহ মেশিনগান।

গর্জে ওঠে মেশিনগান। অবিশ্রান্ত গোলাবর্ষণ। অসম সাহসে জীবনকে বাজি রেখে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। ঠেকিয়ে রাখেন শত্রুসেনাদের। এভাবে তিনি তাঁর কোম্পানির সহযোদ্ধাদের নিরাপদ অবস্হানে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।

আর এদিকে তাঁর গোলাবর্ষণে শত্রুপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নিহত হয় বেশ কয়েকজন।

মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট পাকসেনাদের এইচএমজি পোস্ট ধ্বংস বা নিউট্রালাইজড করা। ওখানকার গুলিবর্ষণই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতি সাধন করছিল।

হামিদুর রহমান এক পর্যায়ে ক্রল করে পাকক্যাম্পের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যান। তাঁর থেকে ওদের দূরত্ব মাত্র দশ গজ। তিনি মুহূর্ত বিলম্ব না করে একটি এইচএমজির উপর গ্রেনেডের পিন খুলে ছুড়ে মারেন। সেখান থেকে গোলাগুলি থেমে যায়।

হামিদুর রহমান বাঘের মতো সেই বাংকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। পাশের বাংকার থেকে পাকসেনারা এবার তাঁকে লক্ষ্য করেই গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঝাঁজরা হয়ে যায় সাহসী সৈনিকের দেহ। বজ্রনির্ঘোষে বাংলার জয়ধ্বনি ঘোষণ করে তিনি তাঁরই দেশের মাটিকে ধারণ করেন।

হাফিজ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শহিদের মরদেহ এখনো ওখানেই। যে করেই হোক তাঁর পবিত্র দেহকে উদ্ধার করতে হবে। ধ্বংস করতে হবে ঘাতকদের।

ব্রাভো কোম্পানির হাফিজদের কাছে এতোসব ঘটনার বিবরণ পৌঁছে আরো পরে। পরিকল্পনাটা তাঁদের জানা, চার্লি কোম্পানি ধলইয়ের পাকআর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ চালাবে। ধলই থেকে দুই মাইল দূরে তাঁরা বন-জঙ্গলপূর্ণ চা বাগানে সবধরনের প্রস্ত্ততি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের থেকে খানিকটা দূরে উত্তরের পাকা সড়কে প্রস্তুত ডেল্টা কোম্পানি।

হাফিজরা পাত্রাখোলা চা বাগান থেকেই শুনতে পাচ্ছিলেন গোলাগুলির আওয়াজ। পরিকল্পনামতো অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছে।

যুদ্ধ চলছে। চলছে তো চলছেই। এ যেন থামার নাম নেই। উªগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন হাফিজ।

টেনশন বাড়ছে। কোনো খবরাখবর না পেয়ে এক ধরনের অস্হিরতা কাজ করছে মনের ভিতর। বেশ তো সময় পেরিয়ে গেল। তাঁদের রক্ষণাবু্যহের সামনে এখন পর্যন্ত কোনো পলাতক জনমানুষকে দেখা যাচ্ছে না।

হাফিজ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর কোম্পানির ক্যাপ্টেন মাহবুবকে লিডার করে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচজনের একটা টিম পাঠিয়ে দিলেন ধলইয়ের দিকে। ওঁরা পরিস্হিতিটা সরেজমিন জরিপ করে আসুক। বিশেষ করে শত্রুপক্ষের গতিবিধি তত্পরতা।

ওঁরা যাওয়ার আধ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ওঁদের যাত্রাপথে গোলাগুলির আওয়াজ। মেশিনগানের শব্দও ভেসে এলো।

কিছুক্ষণ পরেই হৈহৈ করতে করতে টিমটা ফিরে এলো। তাঁদের সাথে বন্দি একজন আহত পাকসেনা।

পুরো ঘটনাটা জানা গেল টিমের কাছ থেকে। ওঁদের কথাবার্তা থেকে ধলইয়ের রণক্ষেত্র সম্পর্কেও খানিকটা আভাস পাওয়া গেল।

ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে মুক্তিযাদ্ধাদের টিমটি খানিক এগিয়ে যেতেই সামনে কালো পোশাকধারী একজনকে দেখতে পায়। সাথে সাথে টিমটি আড়ালে পজিশন নেয় এবং গতিবিধি লক্ষ করতে থাকে। সংখ্যায় ওরা দশজন। শত্রুসৈন্য। সুদূর পাকিস্তান থেকে তাদেরকে আনা হয়েছে বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তারা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের লোক। তাদের কথাবার্তা থেকে জানা গেল, এটাই তাদের জীবনের প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধে তাদের কোনোই অভিজ্ঞতা নাই। ধলইয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করলে গোলাগুলির শব্দে, বিশেষ করে মেশিনগান ও কামানের শব্দে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে ওঠে। জীবন বাঁচানোর দায়। রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসে।

কিন্তু তাদের কপাল মন্দ। এর মধ্যেই মাহবুবের টিম লাইট মেশিনগানে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

ঘটনাস্হলেই ছয়জন নিহত হয়। বাকি সবাই কোনোরকমে পালিয়ে যায়। আর আহত অবস্হায় বন্দি হয় এই শত্রুসেনা। একজন সুবেদার।

নাম তার গুল চমন। বাংলা অর্থ বাগানের ফুল। মাথার সব চুল বাংলার শন ফুলের মতো সাদা। দেহ গড়নে রোগাপটকা। আসলে সে পাকিস্তানি প্যারামিলিশিয়ার একজন সুবেদার। তার ভাষায় বাংলা মুলুকে তাদেরকে আনা হয়েছে কয়েকদিন আগে।

সে বেশ আহত। অনবরত রক্তক্ষরণ তাকে আরো দুর্বল করে তুলছে। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্হা করল। এতে অবস্হার খুব একটা উন্নতির আশা করা গেল না।

তাকে যতবারই যত ভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলো, তার নিজের উদু‌র্ ভাষায় একই জবাব, যার অর্থ করলে দাঁড়ায়: জয় বাংলা। দোয়া করি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক।

চার ঘণ্টার মধ্যেই বিদেশ-বিভূঁয়ে অচেনা জায়গায় অজানা লোকজনের সামনে তার মৃতু্য হয়।

বিকেলের দিকে আরেক ঘটনা। পাকা সড়কে মুক্তিযোদ্ধাদের ডেল্টা কোম্পানির অবস্হান। এই অবস্হান পাকসেনাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধক বলে তারা গণ্য করল। হামলা চালাল ডেল্টা কোম্পানির উপর। ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার পাটোয়ারীর অনুরোধে ভারতীয় বাহিনী কামানের গোলা হামলা চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করল। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনসহ ৪০ জন সেনার মতো হতাহত হয়। এর মধ্যেই সন্ধ্যারাত নেমে আসে। এই এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যরা রাতে বাইরে বেরুতে বা সংঘাতে লিপ্ত হতে সাহস পায় না। তাই রাতে আর কোনো ঝামেলা হলো না।

স্বপ্নটা কি হাফিজের চোখে সেই সুযোগেই ঘনিয়েছিল? সারা দিনের যুদ্ধ, উত্তেজনা ও বিজয় আনন্দে রাতে যখন যত অল্প সময়ের জন্যই ঘুম আসুক না কেন, সুখ-স্বপ্ন চোখ জুড়িয়েই নেমে এসেছিল।

পাশেই মেজর চৌধুরীর সাড়া পাওয়া গেল। ঘুম থেকে উঠেছেন। আবার একটি যুদ্ধমুখর কর্মচঞ্চল দিন শুরু হতে যাচ্ছে।

মেজর চৌধুরী উঠে বসলেন। চোখ কচলাতে কচলাতে বললেন: সকাল হয়ে গিয়েছে?

হাফিজ সম্মতি জানিয়ে বললেন: হুম। তবে এখনো সূর্য ওঠেনি।

মেজর চৌধুরী বললেন: তা বেশ বুঝতে পারছি। বাতাসে গোলাবারুদের গন্ধ নেই, গোলাগুলির দুমদুম শব্দ নেই। তা থেকেই বুঝতে পারছি, সূর্যদেব দেখা দেননি। আজ তারিখটা কত যেন?

হাফিজ বুঝি একটু আনমনা হয়ে পড়েছেন। কিছু একটা ভাবছেন। স্বপ্নের কথাটাই কি?

মেজর চৌধুরীর শেষ প্রশ্নে সপ্রতিভ হয়ে উঠলেন। বললেন: আজ ২৯ শে অক্টোবর।

একটু ভাবলেন। তারপর সরাসরি তাকালেন মেজর চৌধুরীর দিকে। বললেন: আজ আমার জন্মদিন।

সাথে সাথে উল্লাস প্রকাশ করলেন মেজর চৌধুরী। সোল্লাসে বলে উঠলেন: হ্যাপি বার্থ ডে।

যুদ্ধের বাংকারে বসে সহযোদ্ধার এমন শুভ কামনা যেন পাত্রাখোলার পুরো চা বাগানে গমগমে আওয়াজ তুলল। পাখিদের কলধ্বনির সাথে সে আওয়াজ মিশে গেল।

হাফিজ সসংকোচে বললেন: ধন্যবাদ।

তারপর একটা বক্র হাসি খেলে গেল ঠোঁটে। মজা করে বললেন: দোয়া করবেন জন্মদিন যেন মৃতু্যদিবসে পরিণত না হয়।

দুজনেই হেসে উঠলেন একসাথে।

বাংকারেই দুজন হাতমুখ ধুয়ে জন্মদিন পালন করতে বসলেন। কেকের বদলে দু মুঠো চিড়া, একটু গুড় আর পাহাড়ি নালার পানি— এই দিয়েই জন্মদিনের প্রাতঃরাশ সাঙ্গ হলো।

আর তখনই গোলাগুলির শব্দ ভেসে এলো। মুক্তিযুদ্ধের আরো একটি দিন শুরু হলো।

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আদল

মায়ের ঘ্রাণ

রাঙাদি

মেনোপজ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সেদিন যখন বিলুপ্ত হয়েছিলাম

অমলার যুদ্ধ 

লাল নিশান

‘গাঁওবুড়ো’ অর্জন করল আমেরিকার ও’ হেনরি