শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

গল্প

প্রতিনিধি

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৫:৫০

প্রবল উত্তেজনা আর কান্নায় অজ্ঞান হয়ে যায় মেয়েটি। মৃতদেহগুলো চলে যায় পোস্টমর্টেমে। আহতদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। কান্না আর্তনাদ আহাজারি পাক খেতে থাকে হাসপাতালের বাতাসে। এর আধঘণ্টা পরে প্রবল কান্না আর আর্তনাদের সুঙ্গে যুক্ত হয় একটা মিহি স্বরের কান্না। এ যেন কান্না নয়, জীবনের গান। গাইনি ওয়ার্ডে জন্ম নেয় একটা ফুলের মতো ফুটফুটে শিশু।

মারাত্মক ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। দুটো ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে লাইনচ্যুত হয়েছে ট্রেন দুটো। এটুকুই না। ট্রেনের বগিগুলো ছিটকে পড়েছে লোকালয়ে। ট্রেনের যাত্রী ছাড়াও হতাহত হয়েছে লাইন পাশ্ববর্তী রাস্তাঘাট, দোকানপাটের অনেক মানুষ। আগে মুখোমুখি সংঘর্ষ বলতে দুটো বাসের সংঘর্ষ বোঝাত। এখন পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে ট্রেন দুর্ঘটনার সংখ্যা। ক্রসিং পার হতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ট্রেনে কাটা পড়া লাশগুলোর দিকে তাকানো যায় না মোটেও। কী বীভত্স যে চেহারা হয়!

ডাক্তার হিসেবে মমোর পার হয়েছে তিন বছর। এখনো সে মৃত্যু-খুন-দুর্ঘটনা-অসময় ডেলিভারির ঘটনাগুলো সহজে নিতে পারে না। চোখ দিয়ে জল গড়ায়। মৃতের আত্মীয়স্বজনের আড়ালে চোখের জল লুকায়। এ নিয়ে সহকর্মীরা মৃদু হাসাহাসিও করে। কী কাণ্ড! এমন করলে ও ভালো ডাক্তার হবে কী করে! এত আবেগি, এত নরম!

কাউকে কিছু বলে না মমো। তার বিশ্বাস ডাক্তারদের মন নরম হওয়া খুবই জরুরি। সংবেদনশীল হূদয় না থাকলে মানুষের মনের কাছে পৌঁছাবে কী করে? রোগী কেন ডাক্তারকে বিশ্বাস করবে, অকপটে সব কথা খুলে বলবে? আর সবকিছু খুলে বলতে না পারলে ভালো চিকিত্সা হবে কী করে? ডাক্তারি তো শুধু পেশা না, সেবাও। সেবার মনোভাব না থাকলে ডাক্তারি পড়া কেন! রোগীর সঙ্গে একাত্ম না হতে পারলে তার যাতনা বুঝবে কী করে? কীভাবে উঠে আসবে সঠিক ওষুধ? ডাক্তারকে তাই ওষুধের সঙ্গে মমতাও মিশিয়ে দিতে হয়। মিশিয়ে দিতে হয় বিশ্বাস আর ভরসাও।

এ চিন্তা মমোর একান্ত নিজস্ব। এটা সে কারো সঙ্গে শেয়ার করে না। মমো যা বিশ্বাস করে সেটাই করে। তাছাড়া সে খুবই আত্মমুখী, কম কথার মানুষ। একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছেলেবেলা থেকে কথা বলার মানুষ পেয়েছে কম। কথা না বলতে বলতে এখন এটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এ নিয়ে তার সমালোচনাও আছে। বাবা-মাকে অনেক কথাও শুনতে হয় সে অসামাজিক বলে।

কিন্তু রোগীদের সঙ্গে সে একেবারে অন্যরকম। প্রচুর কথা বলে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয় তাদের সমস্যাগুলো। হাসি-ঠাট্টাও করে। মমো প্রাইভেট প্রাকটিস করে না। হাসপাতালেই পুরো সময়টা দেয়। সে মনে করে তার যা আছে তাতে আলাদা করে প্রাকটিসের প্রয়োজন নেই।

সবে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে। আজ অনেক ব্যস্ততা ছিল। প্রচুর রোগী হয়েছে। রোগীদের সামলে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি অনেকটা দূরে। রাস্তায় তীব্র যানজট। যানজট ঠেলে আসতে অনেক সময় লেগেছে। খাওয়া হয়নি। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসবে কেবল। মা বারবার ডাকছেন। এমন সময় হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। এমার্জেন্সি বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ডাক্তার মি. মোহসিন ফোন করেছেন, ডা. মমো, আপনি কোথায়?

—ডিউটি শেষ করে এইমাত্র বাসায় এলাম স্যার।

—হ্যাঁ জানি আপনার ডিউটি শেষ। ডা. সুস্মির এখন ডিউটিতে থাকার কথা। তাকে দেখছি না। ফোনও ধরছে না। এদিকে একটা এমার্জেন্সি হয়ে গেছে।

—কী হয়েছে স্যার?

—ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছে। টেলিভিশনে দেখাচ্ছে। আপনি বোধহয় দেখেননি। সারা হাসপাতাল লাশে ভরে গেছে। এদিকে হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই।

—আমি আসছি স্যার।

—কিন্তু আপনার বোধহয় খাওয়া হয়নি।

—তা না হোক। দু-এক বেলা না খেলে কিছু হয় না। আপনি ভাববেন না।

মা হায় হায় করে ওঠেন। পিছু পিছু ছোটেন।

—না খেয়ে যাসনে মা।

মমো কোনোদিকে তাকায় না।

 

২.
হাসপাতালে পৌঁছায় মমো। হাসপাতালজুড়ে ট্রেনে কাটা মানুষ। মেঝেতে পা ফেলার উপায় নেই। সাংবাদিকে ভরে গেছে হাসপাতাল। তাদের জন্য কাজে সমস্যা হচ্ছে। আরো কিছু ডাক্তার এসেছেন। মমো পৌঁছানোর দু-এক মিনিট পরে স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র আর রেল মন্ত্রী আসেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ফোন করে খবর নিয়েছেন।

মমোকে দেখে ডা. মোহসিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।

—এসেছেন। আপনার মতো ভরসা আর কাউকে করতে পারি না। চলুন কাজে লেগে পড়ি। কী করে যে সামলাব!

কথা শেষ হবার আগেই কাঁদতে কাঁদতে ঝড়ের বেগে চেম্বারে ঢুকে পড়ে বছর পঁচিশের একজন যুবতী। ভরা পোয়াতি।

—আমার স্বামীর এখনো জীবন আছে। আমি দেখে এসেছি। ওকে বাঁচান। আমি অন্তঃসত্ত্বা, দেখতেই পাচ্ছেন। দশ বছর পর সন্তান আসছে আমাদের জীবনে। ওকে না দেখে যেতে পারলে মরেও শান্তি পাবে না আমার স্বামী।

ডা. মোহসিন কিছু বলার আগেই ছুটে বের হয় মমো।

—কোথায়, কোথায় আপনার স্বামী?

ডাক্তার মোহসিন পেছন থেকে ডাকেন, ড. মমো মমো, শুনুন।

মেয়েটি মেঝেতে শোয়ানো একজন যুবকের পাশে নিয়ে যায় মমোকে। তার চেহারার দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে মমো। চেনার উপায় নেই।

—এই যে, এই যে দেখুন। দেখুন ওর শ্বাস পড়ছে। বুকে কান পেতে শুনেছি। আমার যে কোনো মুহূর্তে বাচ্চা হয়ে যাবে। সকালে খুব পেইন হচ্ছিল। ওকে ফোন করেছিলাম। তাই দ্রুত অফিস থেকে আসছিল আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে। জানেন, ও ভালো দৌড়বিদ। অনেক পুরস্কার পেয়েছে। ট্রেন আসতে দেখেছিল বোধহয়। ভেবেছিল দৌড়ে পার হতে পারবে। এমন আগেও করেছে। আজ পারেনি।

মমো রোগীকে পরীক্ষা করে। ওর চোখে জল আসে। মেয়েটির দিকে তাকাতে পারে না।

—ডাক্তার আপা, কী হলো?

—আপনি আমার সাথে আসুন।

—ডাক্তার আপা, প্লিজ বলেন ও বেঁচে আছে তো? আপনার মুখ দেখে কেমন যেন লাগছে। আপা ও কি তাহলে বেঁচে নেই। ও যদি চলে যায় আমি মা হতে চাই না। কিছুতেই না।

প্রবল উত্তেজনা আর কান্নায় অজ্ঞান হয়ে যায় মেয়েটি। মৃতদেহগুলো চলে যায় পোস্টমর্টেমে। আহতদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। কান্না আর্তনাদ আহাজারি পাক খেতে থাকে হাসপাতালের বাতাসে। এর আধঘণ্টা পরে প্রবল কান্না আর আর্তনাদের সঙ্গে যুক্ত হয় একটা মিহি স্বরের কান্না। এ যেন কান্না নয়, জীবনের গান। গাইনি ওয়ার্ডে জন্ম নেয় একটা ফুলের মতো ফুটফুটে শিশু। চোখে পানি নিয়ে সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে মমো। জ্ঞান ফিরে মেয়েকে দেখে মুখ ফেরায় ওর মা। ডুকরে কেঁদে ওঠে। মমো ওর মাথায় সান্ত্বনার হাত রাখে!

—মন খারাপ করবেন না। মুখ ফিরিয়ে থাকবেন না। দেখুন কী ফুটফুটে হয়েছে! একদম আপনার স্বামীর মতো। আপনার স্বামী তার প্রতিনিধি রেখে গেছেন।

মেয়েটির স্বামীর ক্ষতবিক্ষত মুখ দেখে মমো বুঝতে পারেনি সে দেখতে কেমন ছিল! তারপরও বলে। আর এই মিথ্যের জন্য একটুকু গ্লানিও বোধ হয় না তার।

মা বাচ্চার দিকে মুখ ফেরায়। ওর মাথা বোঝাই কুচকুচে কালো চুল। স্বামীর ঠিক এমনটি ছিল।

—আপনি ঠিকই বলেছেন। ও দেখতে একদম ওর বাবার মতো হয়েছে। এই যে দেখুন দেখুন কী কুচকুচে চুল, ঠিক ওর বাবার মতো!

ওর দু চোখ ভরা পানি।

—কিন্তু আপা ও তো দেখে যেতে পারল না। ওর বড় সাধ ছিল!

—কে বলে দেখেননি। দেখেছেন তো। আমি ওনাকে পোস্টমর্টেমে নিয়ে যাবার আগে দেখিয়ে এনেছি। উনি দু নয়ন ভরে মেয়েকে দেখে গেছেন।

সদ্যোজাত বাচ্চা বাইরে নেবার নিয়ম নেই। বিশেষ করে এই পরিস্থিতিতে ইনফেকশন হবার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এ মিথ্যের জন্যও কোনো কুণ্ঠা বোধ করে না মমো।

মমোর হাত ধরে কেঁদে ওঠে মেয়েটি।

—ডাক্তার আপা, ডাক্তার আপা!

কিছুক্ষণ পর সামলে বলে, আমি ওর নাম রাখলাম মমো।

মমো বুঝতে পারে না মেয়েটা কী করে জানল ওর নাম। একসময় মনে পড়ে ডা. মোহসিন ওকে নাম ধরে ডেকেছিলেন।

মমো ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে বাথরুমে যায়। মুখ ধোয়ার ছলে চোখের জল লুকায়। ওর মনে প্রবল প্রশান্তি। এত ভালোবাসা ও রাখবে কোথায়!

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন