বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

যানজট: সমাধান কোন পথে?

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ০৭:২৮

তিলোত্তমা নগরী ঢাকা এখন বহুমুখী সমস্যায় ঘোরপাক খাচ্ছে। ঢাকা মহানগরের জীবনযাত্রা ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। সবচেয়ে প্রকট ও জটিল সমস্যাটি হলো যানজট। এটা নিয়ে অনেক বছর ধরে অনেক কথা বলা হচ্ছে, নানা রকমের উদ্যোগের কথাও মাঝেমধ্যে শোনা যায়; কিন্তু এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং তা দিনে দিনে আরো প্রকট হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে বারবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও কোনোটারই সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যাগুলো এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

রাজধানীতে যানজটে আটকা পড়ে প্রতিদিন রাস্তায় অপচয় হয় অসংখ্য কর্মঘণ্টা। এতে সাধারণের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। ট্রাফিক পুলিশ, নগরবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বয়হীনতার কারণে রাজধানীর যানজট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। এক সংস্থা রাস্তা খুঁড়ছে, আরেক সংস্থা গ্যাস লাইন ঠিক করছে, ভালো হবে না, মন্দ হবে, তা না দেখেই পার্কিং অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে—এসব সমস্যার সমাধান হলেই রাজধানীর যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তি মালিকানাধীন গণপরিবহন, প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাস মোটরসাইকেল এসব যানবাহন প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা যেন থমকে আছে।

হিসাব অনুযায়ী ১৮ লাখের বেশি যানবাহন চালাচ্ছেন ‘ভুয়া চালকরা’। যানজট কিছুমাত্র কমাতে চাইলে এই গোড়ার সমস্যাটিই সব কিছুর আগে সমাধান করতে হবে। প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে ঢাকা মহানগরে মোট কতসংখ্যক যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে, পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনে নতুন নিবন্ধনের সংখ্যা নির্ধারিত হবে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় নগরীতে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহন সংকট হয়েছে তীব্র। দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে বড় আকারের বাসের সংখ্যা বাড়ানোর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত এটা বলে আসছেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যানজটের বড় কারণ হলো যত্রতত্র বাস স্টপেজ। গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসগুলোর জন্য রাজধানীতে কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত বাস স্টপেজ চিহ্নিত নেই। এতে করে একের পর এক গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে অন্য গাড়ির চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, ফলে যানজট তৈরি হচ্ছে।

বর্তমানে যানজটের কারণে আমাদের এখানে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিন গুণ। সে জ্বালানি দিয়ে দেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে উত্পাদন করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায়। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কিংবা কোথাও যাওয়ার প্রয়োজনে যানজটে থাকার কারণে শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা পর্যাপ্ত বিনোদনের সুযোগ পাচ্ছে না। মহাপ্রকল্প থেকে নজর সরিয়ে গণপরিবহন বাড়িয়ে একদিকে সরকারের খরচ কমিয়ে আনা এবং যানজটমুক্ত নগরী গড়তে রাজনৈতিক পদক্ষেপ দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর রাস্তায় যানজট নিরসনে একই রাস্তায় একাধিক পরিবহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।

নগরীর প্রতিটি রাস্তায় লেন সিস্টেম করে এবং তা মেনে চললে যানজট অধিকাংশে কমে আসবে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ভেতর আনতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি যানজটের কেন্দ্রবিন্দুগুলো চিহ্নিত করে নির্মাণ করা হচ্ছে বড় বড় ফ্লাইওভার। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়ে গেছে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকাকে যানজটমুক্ত নগরী হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা কেউ দিতে না পারলেও সমস্যা যে কমবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বাইরে আরো বেশি সড়ক নির্মাণ, রিকশা চলাচল আবাসিক এলাকাভিত্তিক করা, ফুটপাতগুলো ব্যবহার উপযোগী করা, অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা বাস্তবায়নসহ রেল ও নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত যানজট নিরসনের জন্য দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পনা দরকার, যা ঢাকা শহরের মতো একটি সমস্যাবহুল শহরের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি হলেও তা যেন কার্যকরী হয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন