রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

‘গাঁওবুড়ো’ অর্জন করল আমেরিকার ও’ হেনরি

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০৯:৫০

কথাসাহিত্যিক অমর মিত্র তাঁর ‘গাঁওবুড়ো’ গল্পের ইংরেজি অনূদিত সংস্করণের জন্য ২০২২ সালের ও’ হেনরি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ইংরেজি ভাষায় লিখিত শ্রেষ্ঠ গল্পের জন্য এই পুরস্কারটি ১৯১৯ সালে চালু করেন বিশ্বখ্যাত ছোটগল্পকার ও’ হেনরির বন্ধু ও আত্মজনেরা। শতাব্দী পেরিয়ে এসে এখন ভাষার প্রাচীর ভেঙে গেছে, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত অন্য ভাষার গল্পও এখন বিবেচিত হয়। আর এই সুবাদেই এ বছর অমর মিত্রের হাত ধরে বাংলা ছোটগল্প পেল ও’ হেনরি পুরস্কারের বিরল সম্মান। বাংলাদেশের তাহমিমা আনাম ২০১৭ সালে ও পুরষ্কার পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সাময়িকীতে প্রকাশিত ইংরেজি ভাষায় লেখা গল্পের সাহিত্যমূল্যের বিচারে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

আমরা অভিনন্দন জানাই বাংলা ছোটগল্পের অমর স্রষ্টাকে।

এই পুরস্কার অর্জনের পর ৫ এপ্রিল অমর মিত্র তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন: ‘রাতে ঘুমতে দেরি হলো, রাতে আমার ঘুম হলো না। এক প্রত্যাখ্যাত গল্প গাঁওবুড়ো। অমৃত পত্রিকার পুজো সংখ্যার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার পরেও গল্প প্রকাশিত হয়নি পত্রিকার বিজ্ঞাপন এসে যাওয়ায়। সাধারণ সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পর সম্পাদক বড় লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক আড্ডায় হাজির। মস্ত শরীর নিয়ে চারতলায় উঠে এলেন। হাতে কুবেরের বিষয় আশয়। জোড়হাতে বললেন, তুমি আমাকে মার্জনা করবে ভাই, পুজো সংখ্যার সেরা গল্প আমি বাদ দিলাম। এই বইটা তোমায় দিলাম। সেই প্রথম পুরস্কার। এই গল্পের অনুবাদ নিয়ে ১৯৯০ নাগাদ দিল্লি গিয়েছিলাম সাহিত্য আকাদেমির ভারত-আমেরিকা লেখক কর্মশালায়। আমেরিকান লেখক কিট রিড এসেছিলেন। তিনি গল্প পড়ে আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন চাকরি ছেড়ে পেশাদার লেখক হতে।

বলেছিলাম, দিদি, তা হবে না, আমার সংসার চলবে না। খাওয়াবে কে? কিটের সঙ্গে এয়ার মেল চিঠিতে যোগাযোগ ছিল বহুদিন। ২০১৭ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর তিনি লস এঞ্জেলস শহরে প্রয়াত হন। কিট এবং শ্যামলদা বেঁচে থাকলে আনন্দ হতো আরো আরো। ...অনীশ ও মালবী গুপ্ত কম বয়সের বন্ধু। অনীশ যে কতবার ঘষামাজা করেছে। নতুন করে লিখেছে। ও না অনুবাদ করলে জগৎ সভায় যেত না এই গল্প।...’

বিপন্ন গাঁওবুড়ো এদিক সেদিক মানুষ খোঁজে। তারপর হঠাৎ একসময় পায়ের কাছে ধূমায়িত লণ্ঠন ঝুলিয়ে একটি মানুষ ফকির চাঁদকে পার হতে যায়। গাঁও বুড়ো হাঁসফাঁসিয়ে চিৎকার করে ওঠে, কে যায় গা মানুষ, রসো।

‘গাঁওবুড়ো’ গল্পের শেষাংশের চুম্বক অংশ ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

‘... নদী খেয়ে ফেলেছে গাঁয়ের সবটাই। এখানে সেখানে ইতস্তত বাস্ত্তভিটের চিহ্ন ছড়িয়ে। পাল-কুল, বাবলা আর কতরকম গাছগাছালির ঝোপে অন্ধকার। আর আশ্চর্য কোথাও একটা মানুষও নেই। বুড়োর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। দৃষ্টি অস্বচ্ছ। অস্বচ্ছ চোখেই সে মানুষ খোঁজে। মানুষ তো কেউ না কেউ থাকবে। বড়বাবুর গাঁ তো এটাই হবে এর পরে নদী নিয়েছে বিপজ্জনক বাঁক, আর গ্রাম কোথায়?

শরীর নিঝুম হয়ে আসছে। এটা হয়ত কন্যাডিহা নয়। পথ ভুল হলো। আশপাশে কোথাও আছে। অন্য কোথাও। অন্য কোনোখানে। ক্রমে অন্ধকার বিস্তৃত হয়। বুড়োর কাছে নদী পেরিয়ে বাতাস আসে। অন্ধকার গাঢ় হয়।

বিপন্ন গাঁওবুড়ো এদিক সেদিক মানুষ খোঁজে। তারপর হঠাৎ একসময় পায়ের কাছে ধূমায়িত লণ্ঠন ঝুলিয়ে একটি মানুষ ফকির চাঁদকে পার হতে যায়। গাঁও বুড়ো হাঁসফাঁসিয়ে চিৎকার করে ওঠে, কে যায় গা মানুষ, রসো।

সেই মানুষ থেমে যায়।

বড়বাবুর ঘর কোন গাঁয়ে?

বড়বাবু! বিস্ময়ে অন্ধকারে সে চেয়ে থাকে বুড়োর দিকে।

গাঁওবুড়ো কাঁপা গলায় বড়বাবুর মহিমার কথা বলে। তিনি পরিশ্রান্ত মানুষকে বিশ্রাম দেন। অফুরন্ত জীবনের কথা বলেন। অবলীলায় কত দুরূহ সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। তিনি বড় মানুষ। বিশাল এক পুরুষ। রোগ শোক তাপে তাঁর কাছেই আশ্রয়।

মানুষটি খনখনে গলায় হেসে ওঠে, ‘হা হা তুমু স্বপ্ন দিখো গাঁওবুড়ো, এমন মানুষ কই? কোথাও নেই। এমন মানুষ আজকাল আর থাকে না, থাকে না।

লোকটা মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পা বাড়ায়। ফকিরচাঁদ আবার একা হয়ে যায়।

তখন অন্ধকারের পৃথিবীতে চাঁদ ভেসেছে গেরুয়া বর্ণের ডিম্বাকার। তার সামনে অন্তহীন চরাচরে কেউ নেই। সেই বিশাল পুরুষ নয়। একমাত্র আছে বিশাল বালুচর নিয়ে এই নদী। সব কেমন রহস্যময়। বুড়োর মাথার ঠিক থাকছে না। সব ভুল হয়ে যাচ্ছে। বড়বাবু তুমি থাকলে না। মানুষে বলে এমন মানুষ আর থাকে না। তুমি থাকলে না তাহলে আমার কষ্ট, ছোট সোনা মাকিডর দুঃখ, কুষ্ঠ রোগীর জীবন আর সেই সাঁওতাল গাঁয়ের কষ্ট বেদনা কীভাবে দূর হয়ে যাবে?

সে নেমে গেছে বালুচরে। বিস্তৃত বালির চরাতে। অল্প আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠেছে বালুকণা। বিস্তীর্ণ বালিতে নেমে উদার আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে আর্তনাদ করে ওঠে যখের মতো পাহারা দিবো কী করে বড়বাবু, অন্ধ চোখে বেঁচে থাকবু কী করে বড়মানুষ?

এই নদীটা রয়ে গেছে অথচ সেই মানুষ থাকল না। নিঃশব্দে কখন চলে গেছে অথচ দুঃখ কষ্ট বেদনা আর বিশ্বাসটুকু রেখে গেছে গাঁওবুড়োর মনে।

চলি গেলে তো সব দুঃখ গুলান নি গেলে নি কেনে? বুড়ো ফিসফিসিয়ে নদীর সঙ্গে কথা বলে। দূরে কোথাও ছপছপ শব্দ হয়। বড় মানুষ হেঁটে যায়।

গাঁওবুড়ো দ্রুত দৌড়তে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে বালুচরে। আকাশের নিচে পৃথিবীর ওপর পড়ে থাকে। সব নৈঃশব্দে ডোবে। তারপর একসময় সবুজ আলো জ্বালিয়ে এক উড়োকল নৈঃশব্দ ভেঙে চলে যায়। ফেরার পথে সেই জঙ্গলে, সেই মাঠে, সেই খালের সামনে অপেক্ষা করে থাকে যে যেমন। গাঁওবুড়ো কাল ফেরেনি, আজ ফিরল না, তবু ফিরবে নিশ্চয়।’

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আদল

মায়ের ঘ্রাণ

রাঙাদি

মেনোপজ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সেদিন যখন বিলুপ্ত হয়েছিলাম

অমলার যুদ্ধ 

লাল নিশান

বাংকারে যুদ্ধ ও জন্মোৎসব